হজ্জের ওয়াজিবসমুহ


হজ্জের ওয়াজিব নয়টি
১. সায়ী করা। অর্থাৎ সাফা মারওয়ার মাঝে
দ্রুত চলা। (কুরআন পাকের বয়ান থেকে তাই মনে করা হয়। কিন্তু আহলে হাদীসের
মতে সায়ী ফরয। তার দলীল নিম্নোক্ত হাদীসঃ
*******আরবী*********
অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ঐ ব্যক্তির হজ্জ ও ওমরাহ পরিপূর্ণ বলে গণ্য করেন না যে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ী করলো না। (মুসলিম)
২. মুযদালফার অবস্থান করা। অর্থাৎ ফজর শুরু হওয়ার পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কোনো সময়ে সেখানে পৌছা।
৩. রামী করা। অর্থাৎ জুমরাতে পাথর মারা।
৪. তাওয়াফে কুদুম করা। অর্থাৎ মক্কায়
প্রবেশ করার পর সর্বপ্রথম খানায়ে কাবার তাওয়াফ করা। তাওয়াফে কুদুম তাদের
জন্যে ওয়াজিব যারা মীকাতের বাইরে থাকে যাদেরকে আফাকী বলা হয়।
৫. বিদায়ী তাওয়াফ করা। অর্থাৎ খানায়ে কাবা থেকে শেষ বিদায়ের সময় তাওয়াফ করা। এটাও শুধু আফাকীদের জন্যে ওয়াজিব।
৬. মাথা মুড়ানো বা চুল ছাটা। হাজ্জের
আরকান শেষ করার পর মাথা মুড়িয়ে ফেলা অথবা চুল ছাটা। যুলহজ্জের দশ তারিখে
জুমরাতে ওকবায় পাথর মারার পর মাথা মুড়িয়ে ফেলা বা চুল ছাটা ওয়াজিব।
৭. কুরবানী একত্রে পড়া। অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে যোহর আসর একত্রে এবং মুযদালাফায় মাগরিব এশা একত্রে পড়া ওয়াজিব।
৯. রামী, মস্তক মুণ্ডন ও কুরবানী ক্রমানুসারে করা।
সায়ী
অভিধানে সায়ী শব্দের অর্থ যত্ন সহকারে
চলা, দৌড়ানো এবং চেষ্টা করা। পারিভাষিক অর্থে সায়ী বলতে হজ্জের সেই ওয়াজিব
আমল বুঝায় যাতে হেরেম যিয়ারতকারী সাফা ও মারওয়া নামাক দুটি পাহাড়ের মাঝে
দৌড়ায়।সাফা বায়তুল্লাহর দক্ষিণে এবং মারওয়া উত্তর দিকে অবস্থিত। আজকাল এ
দুটি পাহাড়ের নামমাত্র চিহ্ন অবশিষ্ট আছে এবং তাদের মধ্যবর্তী স্থানে দুটি
পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। একটি সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত দৌড়ের জন্যে
এবং অপরটি মারওয়া থেকে সাফা আসার জন্যে। অর্থাৎ দুটি পাশাপাশি আপ ডাউন সড়ক।
এ সড়ক দুটির ওপর বিরাট ছাদ তৈরী করে সড়ক দুটিকে ঢেকে দেয়া হয়েছে যাতে করে
সায়ীকারীগণ রৌদ্রে কষ্ট না পায়।
সায়ীর হাকীকত ও হিকমত
কুরআন পাক বলে-
*******আরবী*********
সাফা ও মারওয়া নিশ্চিতরূপে আল্লাহ তায়ালার
নির্দেশাবলীর মধ্য গণ্য।…….. শব্দের বহুবচন। কোনো আধ্যাত্মিক মর্ম এবং
কোনো ধর্মীয় স্মৃতি অনুভব ও স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য যে জিনিস নিদর্শন
স্বরূপ নির্ধারিত করা হয় তাকে ……… বলে। প্রকৃতপক্ষে এসব স্থান (সাফা
মারওয়া) আল্লাহ পুরস্তি এবং ইসলামের বাস্তব বহিঃপ্রকাশের স্মরণীয় স্থান।
মারওয়া হচ্ছে সেই স্থান যেখানে আল্লাহর খলীল হযরত ইবরাহীম (আ ) তার একমাত্র
পুত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ ) কে উপুড় করে শুইয়ে তার গলায় ছুরি চালাতে
উদ্যত হয়েছিলেন, যাতে করে তার দেখা স্বপ্ন কার্যে পরিণত করতে পারেন। সেই
সাথে তার জীবনের প্রিয়তম বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে কুরবানী করে তার
স্বীয় উক্তির *******আরবী********* (আমি পুরোপুরি নিজেকে রাব্বুল আলামীনের
অধীন করে দিয়েছি) বাস্তব সাক্ষ্যদান করেন।
ইসলাম বা আত্মসমর্পণ করার এ অভিনব দৃশ্য
দেখার সাথে সাথে আল্লাহ তাকে ডেকে বলেন, ইবরাহীম! তুমি তোমার স্বপ্নকে
বাস্তব রূপ দিয়েছ। এত কোনো সন্দেহ নেই যে, এ ছিল এক বিরাট পরীক্ষা।
*******আরবী*********
এবং আমরা তাকে এ বলে ডাকলাম, হে ইবরাহীম!
তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। নিশ্চয়ই আমরা নেক লোকদের
এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি। এটা সত্য যে এ হচ্ছে একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা।
সাফা ও মারওয়ার ওপর দৃষ্টি পড়তেই
স্বাভাবিকভাবেই মুমিনের মনে কুরবানীর এ গোটা ইতিহাস ভেসে ওঠে। আর সেই সাথে
ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিস সালামের চিত্রও ভেসে ওঠে।
এ সত্যটিকে মনে বদ্ধমূল করার জন্যে এবং এ
প্রেরণাদায়ক ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য সায়ীকে আল্লাহ তায়ালা মানাসেকের
মধ্য শামিল করে দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেনঃ
*******আরবী*********
অতএব যে ব্যক্তি হজ্জেও ওমরা করে, তার এ
দুয়ের মধ্যে সায়ী করতে কোনো দোষ নেই। আর যে আগ্রহ সহকারে কোনো ভালো কাজ
করে, আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন এবং তার মূল্য দান করেন।
জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার মুশরিকগণ এ দুটি
পাহাড়ের ওপর তাদের প্রতিমার বেদী নির্মাণ করে রেখেছিল। সাফার ওপরে আসাফের
এবং মারওয়ার ওপরে নায়েলার প্রতিমা ছিল। তাদের চারধারে তাওয়াফ করা হতো।
এজন্যে মুসলমানদের মধ্যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিল যে, এ দু পাহাড়ের মাঝে তারা
সায়ী করবে কিনা। তখন আল্লাহ বলেন এ সায়ী করতে কোনো দোষ নেই। এজন্যে যে,
সায়ী বলতে হজ্জের মানাসেকের (করণীয় অনুষ্ঠানাদি) মধ্য গণ। হযরত ইবরাহীম (আ )
কে হজ্জের যেসব মানাসেক শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে সাফা ও মারওয়ার
মাঝখানে সায়ী করার নির্দেশও ছিল। এজন্যে কোনো প্রকার ঘৃণা অনীহা ব্যতিরেকেই
মুসলমানগণ যেন মনের আগ্রহ সহকারে সাফা মারওয়ার সায়ী করে। আল্লাহ মনের
অবস্থা ভালোভাবে জানেন এবং মানুষের সৎ আবেগ অনুভূতি ও সৎকাজ সম্মানের চোখে
দেখেন।
সায়ীর মাসায়েল
১. কাবার তাওয়াফের পর সায়ী করা ওয়াজিব। তাওয়াফের পূর্বে সায়ী জায়েয নয়।
২. সায়ী করার সময় হাদাসে আসগার ও হাদাসে আকবার থেকে পাক হওয়া ওয়াজিব নয় বটে, কিন্তু মসনুন।
৩. সায়ী তে সাতবার দৌড় দিতে হয়। এ সাতবারই ওয়াজিব।
৪. তাওয়াফ শেষ করার সাথে সাথেই সায়ী শুরু করা মসনুন, তবে ওয়াজিব নয়।
৫. সায়ী সাফা থকে শুরু করা ওয়াজিব।
৬. সায়ী পায় হেটে করা ওয়াজিব। বিশেষ কারণে সওয়ারীতে করা যায়।
৭. গোটা হজ্জে একবারই সায়ী করা উচিত। তা তাওয়াফে কুদুমের পরে অথবা তাওয়াফে যিয়ারতের পরে হোক। তাওয়াফে যিয়ারতের পর করা ভালো।
৮. সাফা মারওয়ার ওপরে ওঠা বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করে দু হাত দোয়ার জন্যে ওঠানো এবং দোয়া করা মাসনুন।
৯. সায়ী করার সময় কেনাবেচা মাকরূহ। প্রয়োজন হলে কথা বলা যায়।
সায়ী করার পদ্ধতি ও দোয়া
তাওয়াফে কুদুম অথবা তাওয়াফে যিয়ারত যার
পরেই সায়ী করা হোক, তাওয়াফ শেষ করে সাফা পাহাড়ে ওঠতে হবে। তারপর এ আয়াত
পড়তে হয় *******আরবী********* (সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তায়ালার নিদর্শনাবলীর
অন্তর্ভুক্ত)। সাফার এতোটা উচ্চতায় চড়তে হবে যেন বায়তুল্লাহ চোখে পড়ে।
তারপর বায়তুল্লাহর দিক মুখ করে তিনবার আল্লাহু আকবার বলে নিম্নের দোয়া পড়তে
হয়ঃ
*******আরবী*********
আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক এবং
তার কোনো শরীক নেই।  শাসন কর্তৃত্ব তারই এবং সমস্ত প্রশংসাও তার। তিনি
প্রত্যেক বিষয়ের ওপর পরিপূর্ণ শক্তিশালী। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং
তিনি একক। তিনি তার ওয়াদা পূর্ণ করে দেখিয়েছেন, তার বান্দাহকে সাহায্য
করেছেন এবং তিনি  একাই সমস্ত কাফের দলকে পরাজিত করছেন। (মুসলিম)
তারপর দরূদ শরীফ পড়ে যে দোয়া করার ইচ্ছা
তা করা উচিত। নিজের জন্যে, আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনের জন্যে দোয়া করা উচিত। এ
হচ্ছে দোয়া কবুলের স্থান। সে জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্যে
প্রাণভরে দোয়া করা উচিত। তারপর আবার নিম্নের দোয়া পড়তে হয়ঃ
*******আরবী*********
আয় আল্লাহ! তুমি বলেছ আমার কাছে চাও আমি
দিব। আর তুমি কখনো ওয়াদা খেলাফ করো না। তোমার কাছ আমার চাওয়া এই যে, তুমি
যেমন আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দান করেছ, তেমনি এ সম্পদ থেকে তুমি কখনও
আমাকে বঞ্চিত করো না এভাবে আমার যেন মৃত্যু হয় এবং আমি যেন মুসলমান হয়ে
মরতে পারি। (মুয়াত্তা)
তারপর সাফা থেকে নেমে মারওয়ার দিকে চলতে হবে এবং এ দোয়া পড়তে হবে-
*******আরবী*********
হে রব! আমাকে মাফ কর এবং রহম কর। তুমি পরম পরাক্রান্ত-শালী ও মহান।
সাফা থেকে মারওয়ার দিকে যাবার পথে বাম
দিকে দুটি সবুজ চিহ্ন পাওয়া যায়। এ দুটি চিহ্নের মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়ানো
সুন্নাত। এটা শুধু পুরুষদের জন্যে। মেয়েরা স্বাভাবিক গতিতে চলবে। তারা
দৌড়ালে পর্দার ব্যাঘাত ঘটবে।
তারপর মারওয়া পাহাড়ে ওঠার পর ঐসব দোয়া
পড়তে হয় যা সাফার ওপরে পড়া হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে যিকির ও তসবিহতে মশগুল
থাকা উচিত। কারণ এটা হচ্ছে দোয়া কবুলের স্থান।
তারপর মারওয়া থেকে নেমে পুনরায় সাফার দিকে
যেতে হবে এবং ঐসব দোয়া পড়তে হবে যা আসবার সময় পড়া হয়েছে। আর এভাবে দু সবুজ
চিহ্নের মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়াতে হবে। এভাবে সাতবার সাফা মারওয়া দৌড়াদৌড়ি
করতে হবে।
রামী
রামীর আভিধানিক অর্থ নিক্ষেপ করা ও
লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানো। পরিভাষা হিসেবে রামী বলে সেই আমলকে যাতে হাজীগণ তিনটি
স্তম্ভের ওপর পাথর মারে। জুমরাতে রামী করা ওয়াজিব। জুমরাতে জিমার অথবা
জুমরাহ শব্দের বহুবচন। প্রস্তর খণ্ডকে জুমরাহ বলে। মিনার পথে কিছু দূরে
দূরে অবস্থিত মানুষ সমান তিনটি স্তম্ভ আছে। সে সবের ওপরে যেহেতু পাথর মারা
হয় সে জন্যে এগুলোকেও জুমরাত বলা হয়। এ তিনটিকে জুমরায় উলা, জুমরায়ে উস্তা
এবং জুমরায়ে ওকবাহ বলে। মক্কার নিকটবর্তী যেটি, তাকে জুমরায়ে ওকবাহ বলে।
তার পরেরটিকে বলে জুমরায়ে উস্তা এবং তার পরেরটি যা মসজিদে খায়েফের
নিকটবর্তী তাকে জুমরায়ে উলা বলে।
রামীর মর্মকথা ও হিকমত
নবী পাক (স) এর জন্মের কিছুদিন পূর্বে
(অধিকাংশের মতে পঞ্চাশ দিন হবে) হাবশার খৃষ্টান শাসক আবরাহা বায়তুল্লাহ
ধ্বংস করার অসৎ উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে আগ্রাসন পরিচালনা করে। সে
হস্তীবাহিনী সহ বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণের জন্যে অগ্রসর হতে
থাকে। মক্কার অতি নিকটবর্তী মহার উপত্যকা পর্যন্ত সে উপনীত হয়। আল্লাহ
তায়ালা তার এ অসৎ উদ্দেশ্য নস্যাৎ করার জন্য সমুদ্রের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে
পাখি প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। তাদের প্রত্যেকে ঠোটে একটি করে এবং দু পায়ে
দুটি করে ছোট ছোট পাথর নিয়ে এসেছিল এবং গোটা সেনাবাহিনীর ওপরে এমন মুষলধারে
বর্ষণ করলো যে, অধিকাংশ ঘটনাস্থলেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত এবং অবশিষ্ট পথে পড়ে
পড়ে মরতে থাকে। এভাবে আল্লাহ তায়ালা আবরাহার দুরভিসন্ধি নির্মূল করে দেন।
জুমরাতে পাথর মারা সেই ধ্বংসকারী প্রস্তর
বর্ষণের স্মৃতি বহন করে। জুমরাতের ওপরে আল্লাহ আকবার বলে আল্লাহর
শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা করে পাথর নিক্ষেপ প্রকৃতপক্ষে এ সত্য সম্পর্কে দুনিয়াকে
হুশিয়ার করে দেয়া এবং আপন সংকল্পের ঘোষণা করা যে, মুমিনের অস্তিত্ব
দুনিয়াতে আল্লাহর দ্বীনের সংরক্ষণ করার জন্য।
কোনো শক্তি যদি দুরভিসন্ধি সহকারে দীনের
প্রতি বক্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং তাকে মুলোৎপাটনের চেষ্টা করে তাহলে তাকে
নির্মূল করে দেয়া হবে জুমরাতে পাথর নিক্ষেপের মধ্যে দিয়ে এ সংকল্পের ঘোষণা
করা হয়।
রামীর মাসায়েল
১. রামী করা ওয়াজিব। ইমাম মালেকের নিকট জুমরাতে ওকবায় রামী ফরয়। এ রামী না করলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে।
২. নিচু স্থানে দাড়িয়ে রামী করা মসনুন। উঁচু স্থান থেকে করা মাকরূহ।
৩. প্রত্যেক পাথর মারার সময় আল্লাহু আকবার বলা মসনুন।
৪. পাথর যদি জুমরাতে না লাগে অর্থাৎ লক্ষ্যচ্যুত হয় তাহলে তাতে দোষ হবে না।
৫. যুলহজ্জের দশ তারিখে অর্থাৎ প্রথম দিন
শুধু জুমরায়ে ওকবাতে পাথর মারবে। তারপর এগারো বারো তারিখে তিনটি জুমরাতেই
পাথর মারতে হবে। তের তারিখে পাথর মারা মুস্তাহাব। সর্বমোট সাতবার পাথর মারা
হচ্ছে। সাতটি করে উনপঞ্চাশটি পাথর মারতে হয়।
৬. একটি বড়ো পাথর ভেঙ্গে সাতটি করা মাকরূহ।
৭. সাতবারের বেশী পাথর মারা মাকরূহ।
৮. সাতটি পাথর সাতবার মারা ওয়াজিব। কেউ এক সাথে সাতটি পাথর মারলে তা একবারই মারা হবে।
৯. রামীর জন্যে মুযদালাফা থেকে আসার সময়ে
মুহাসসার প্রান্তর থেকে ছোট ছোট পাথর সাথে নিয়ে আসা মুস্তাহাব। জুমরাতের
আশপাশ থেকে পাথর কুড়িয়ে নেয়া মাকরূহ।
উল্লেখ্য যে, জুমরাতের পাশে যেসব প্রস্তর
কণা রয়ে যায় সেগুলো আল্লাহ কবুল করেন। যেগুলো তার দরবারে কবুল হয় তা
ফেরেশতাগণ ওঠিয়ে নিয়ে যান। এজন্য ওখানে পড়ে থাকা পাথর কণা দিয়ে রামী করা
মাকরূহ।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী নবী (স) কে জিজ্ঞেস
করেছিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! প্রতি বছর আমরা যেসব পাথর কনা দিয়ে রামী করি
তার সংখ্যা তো কমে যায় বলে মনে হয়। ইরশাদ হলো, হ্যাঁ, এসবের মধ্যে যেগুলো
আল্লাহ কবুল করেন, তা ওঠিয়ে নেয়া হয়। নতুবা তোমরা দেখতে পেতে যে, পাথর
কণাগুলো পাহাড়ের মত স্তূপ হয়ে যেতো। (দারে কুতনী)
১০. যে পাথর কণা সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা হয় যে, তা নাপাক, তার দ্বারা রামী করা মাকরূহ।
১১. দশ তারিখে রামী শুরু করতেই তালবিয়া
বন্ধ করা উচিত। বুখারী শরীফে আছে যে, হুজুর (স) জুমরায়ে ওকবাতে রামী করা
পর্যন্ত তালবিয়া করতে থাকেন।
১২. দশই যুলহজ্জ রামী করার মসনূন সময়
হচ্ছে সূর্যোদয় থেকে বেলা গড়া পর্যন্ত। তারপরেও সূর্যাস্ত পর্যন্ত জায়েয,
কিন্তু সূর্যাস্তের পর মাকরূহ। অন্য তারিখগুলোতে বেলা গড়া তেকে সূর্যাস্ত
পর্যন্ত রামী করার মসনূন সময়।
১৩. রামী করার জন্যে এক রাত্র মিনাতে কাটানো মসনূন।
১৪. দশ তারিখে জুমরায়ে ওকবায় রামী করার পর অন্য তারিখগুলোতে নিম্ন ক্রম অনুসারে রামী করা মসনূনঃ
প্রথমে জুমরায়ে উলাতে রামী করতে হবে যা মসজিদে খায়েফের নিকটে অবস্থিত। তারপর জুমরায়ে উস্তা এবং তারপর জুমরায়ে ওকবা।
১৫. জুমরায়ে উলা ও জুমরায়ে উস্তায় রামী পায়ে হেটে করা ভালো এবং জুমরায়ে ওকবার সওয়ারীতে থেকে করা ভালো।
১৬. জুমরায়ে উলা ও উস্তায় রামী করার পর
এতটুকু সময় দাড়িয়ে থাকা, যে সময়ে সূরা ফাতেহা তেলাওয়াত করা যায় এবং তাহমীদ,
তাহলীল, তাকবীর, দরূদ প্রভৃতি পড়াতে মশগুল থাকা এবং হাত তুলে দোয়া করা
মসনূন।
১৭. মিনা ও মক্কার মধ্যবর্তীস্থানে এক
প্রান্তর ছিল যাকে মুহাসসাব বলা হতো। এখন সেখানে বসতি হয়ে গেছে। আজকাল তাকে
মুয়াহেদা বলে। বিদায় হজ্জে নবী পাক (স) এখানে অবস্থান করেন। হযরত আনাস
(রা) বলেন, নবী (স) এখানে যোহর, আসর, মাগরিব এবং এশার নামায আদায় করেন।
তারপর কিছুক্ষণ এখানে বিশ্রাম করেন। তারপর এখান থেকে রওয়ানা হয়ে বায়তুল্লাহ
পৌঁছে তওয়াফ করেন। (বুখারী)
অবশ্য এখানে অবস্থান করা সুন্নাত, ওয়াজিব এবং অপরিহার্য নয়। না করলে কোনো দোষ নেই।
১৮. রামী ওসব বস্তুর দ্বারা করা যায় যার
দ্বারা তায়াম্মুম জায়েয। যেমন ইট, পাথর, পোড়া মাটি, পাথর কণা, মাটি, ঢিল
প্রভৃতি। কাঠ বা কোনো ধাতব দ্রব্য দ্বারা রামী জায়েয নয়।
রামী করার পদ্ধতি ও দোয়া
জুমরায়ে ওকবাতে প্রথম রামি করার পূর্বে
তালবিয়া ছেড়ে দিয়ে রামী করা উচিত। রামী করার মসনূন পদ্ধতি এই যে, কোনো নিচু
স্থানে দাড়িয়ে প্রথমে এ দোয়া পড়বে-
*******আরবী*********
আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহ
সর্বশ্রেষ্ঠ। শয়তানের দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করার জন্যে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি
হাসিলের জন্যে (এ কাজ করছি) হে আল্লাহ এ হজ্জকে হজ্জে মাবরুর বানিয়ে দাও।
গোনাহ মাফ করে দাও এবং এ চেষ্টা কবুল কর।
তারপর প্রস্তর কণা আঙ্গুল দিয়ে ধরে
প্রত্যেকটি আল্লাহু আকবার বরে মারবে, জুমরাতে লক্ষ্য করে মারবে। জুমরায়ে
ওকবাতে পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর মারা অথবা বড়ো বড়ো ইট বা পাথর দিয়ে মারা
জুমরাতের নিকটে পড়ে থাকা কণা দিয়ে মারা মাকরূহ।
মাথা মুণ্ডন বা চুল ছাটার মাসায়েল
মাথা মুণ্ডানো অথবা চুল ছাটা হজ্জের আমলসমূহের একটি অপরিহার্য আমল। আল্লাহর এরশাদ হচ্ছে-
*******আরবী*********
তোমরা ইনশাআল্লাহ মসজিদুল হারামে মাথা
মুণ্ডন করে অথবা চুল ছেঁটে নিরাপদে প্রবেশ করবে। আর তোমাদের কোনো প্রকারের
ভয় ভীতি থাকবে না। (সূরা ফাতাহ: ২৭)
আসলে মাথা মোড়ানো বা চুল ছাটা ইহরামের
অবস্থা থেকে বাইরে আসার এবং হালাল হওয়ার একটা নির্ধারিত শরীয়াতের পন্থা। এর
তাৎপর্য সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে শাহ অলীউল্লাহ (র) বলেন, মাথা
মোড়ানোর তাৎপর্য এই যে, এ ইহরামের অবস্থা থেকে বাইরে আসার এক বিশেষ
নির্ধারিত পদ্ধতি। এমন পদ্ধতি যদি নির্ধারিত করা হতো যা মর্যাদার পরিপন্থী,
তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তি আপন আপন ইচ্ছামতো তার ইহরাম খতম করতো এবং পৃথক
পৃথক পদ্ধতি প্রবর্তন করতো। (হুজ্জাতুল্লাহেল বালেগা)
১. দশই যুলহজ্জ কুরবানীর দিন জুমরায়ে ওকবায় রামী করার পর মাথা মোড়ানো বা চুল ছাটা ওয়াজিব।
২. পুরুষদের জন্যে মাথা মোড়ানো অথবা চুল
ছাটা উভয়ই জায়েয। তবে মস্তক মুন্ডানোর ফযীলত বেশী। এজন্যে যে, নবী (স)
মস্তক মুন্ডনকারীদের জন্যে দুবার মাগফেরাতের দোয়া করেছেন এবং যারা চুল ছাটে
তাদের জন্য একবার মাগফেরাতের দোয়া করেছেন। (আবু দাউদ, জামাউল ফাওয়ায়েদ)
৩. মেয়েলোকদের কিছুটা চুল কেটে ফেলা উচিত।
তাদের জন্যে মস্তক মুণ্ডন জায়েয নয়। হযরত আলী (রা) বলেন, নবী (স) মেয়েদের
মস্তক মুণ্ডন করতে নিষেধ করেছেন।
৪. পুরুষরা সমস্ত মাথার চুলের এক আঙ্গুল
পরিমাণ কেটে ফেললে তা জায়েয হবে এবং এক চতুর্থাংশ চুলের কিছু ছেঁটে ফেলাও
জায়েয। মেয়েদের জন্যে তাদের চুলের অগ্রভাগ কিছুটা ছেঁটে ফেললেই যথেষ্ট হবে।
৫.কারো মাথায় যদি চুল মোটেই গজায়নি অথবা টাক থাকে, তাহলে মাথার উপর শুধু খুর বুলালেই যথেষ্ট হবে।
৬. চুল সাফ করার কোনো ওষুধ দ্বারা যদি কেউ চুল সাফ করে তাহলে তাও জায়েয হবে।
৭. মস্তক মুণ্ডন বা চুল ছাটার পর ইহরামের
অবস্থার অবসান হয় এবং তারপর তার জন্যে ওসব কাজ হালাল হয়ে যায়, যা ইহরাম
অবস্থায় হারাম ছিল। তবে স্ত্রী সহবাস তখনও জায়েয হবে না যতক্ষণ না তাওয়াফে
যিয়ারত শেষ করা হয়েছে।

via Blogger http://ift.tt/2toxICI

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s