ইহরাম ও তার মাসয়ালা


১. হজ্জের নিয়ত করে হজ্জের পোষাক পরিধান
করা ও তালবিয়া পড়াকে ইহরাম বলে। হজ্জের নিয়ত করে তালবিয়া পড়ার পর লোক
মুহরেম হয়ে যায়। যেমন নামাজে তাকবীর বলার পর লোক নামাজে প্রবেশ করে এবং
তারপর খানাপিনা, চলাফেরা প্রভৃতি হারাম হয়ে যায়, তেমনি ইহরাম বাধার পর হজ্জ
শুরু হয়ে যায়। তারপর বহু জিনিষ যা ইহরাম বাধার পরে জায়েয ও মুবাহ ছিল,
ইহরাম অবস্থায় সেসব কাজ হারাম হয়ে যায়। এজন্য একে ইহরাম বলে।
২. যে কোন কারণে মক্কা যেতে হোক ভ্রমণ
ব্যবসা বাণিজ্য অথবা যে কোনো উদ্দেশ্যই হোক মীকাতে পৌঁছে ইহরাম বাধা
অত্যাবশ্যক। ইহরাম ছাড়া মীকাত থেকে সামনে অগ্রসর হওয়া মাকরুহে তাহরীমা।
৩. ইহরাম বাধার পূর্বে গোসল করা সুন্নাতে
মুয়াক্কাদাহ। শিশুদের গোসল করাও মসনুন। মেয়েলোক হায়েয নেফাস অবস্থায় তাদের
গোসল করাও মসনুন। হ্যাঁ তবে গোসল করতে অসুবিধা হলে বা কষ্ট হলে অযু অবশ্য
করে নেওয়া উচিৎ। এ অযু বা গোসল শুধু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য, পাক
পবিত্রতার জন্য নয়। এ জন্য পানি না পেলে তায়াম্মুম করার দরকার নেই।
৪. ইহরামের জন্য গোসল করার জন্য চুল কাটা, নখ কাটা ও সাদা চাদর ও তহবন্দ পরা এবং খসবু লাগানো মুস্তাহাব।
৫. মীকাতে পৌছার পূর্বেও ইহরাম বাধা জায়েয। ইহরামের সম্মান রক্ষা করতে পারলে তা ভালো। নতুবা মীকাতে পৌছার পর ইহরাম বাধা ওয়াজিব।
৬. ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজঃ এসবের মধ্যে এমন কিছু আছে যা সব সময় নিষিদ্ধ। কিন্তু ইহরাম অবস্থায় যে সব কাজ করা অধিকতর গোনাহের কাজঃ
১. যৌনকার্যে লিপ্ত হওয়া অথবা যৌন সম্পর্কিত আলাপ আলোচনা করা, আপন স্ত্রীর সাথেও এ ধরনের কথাবার্তায় আনন্দ উপভোগ করা নিষিদ্ধ।
২. আল্লাহর নাফরমানী ও গোনাহ করা।
৩. লড়াই-ঝগড়া ও গালাগালি করা। কর্কশ কথা বলা।
৪. বন্য পশু শিকার করা। শিকার শুধু হারাম
নয়। বরঞ্চ শিকারির সাথে কোন প্রকার সহযোগীতা করা অথবা শিকারিকে পথ দেখানো
অথবা শিকারের দিকে ইংগিত করাও হারাম।
৫. সিলাই করা জামা কাপড়। যেমন শার্ট,
পাঞ্জাবী, পায়জামা, শিরওয়ানী, কোট-প্যান্ট, টুপি, বেনিয়ান, দস্তানা প্রভৃতি
পরিধান করা। মেয়েরা মিলওয়ার কামিজ পড়তে পারে। মোজাও পরতে পারে এবং ইচ্ছা
করলে অলংকার ব্যবহার করতে পারে।
৬. রঙিন ও খোশবুদার রঙে রঞ্জিত কাপড় পরিধান করা। মেয়েরা রেশমী কাপড় পড়তে পারে এবং রঙিন কাপড়ও। অবশ্য খুশবুদার হওয়া চলবে না।
৭. মাথা ও মুখমন্ডল ঢাকা।মেয়েরা মাথার চুল ডেকে রাখবে।
৮. মাথা দাড়ি সাবান প্রভৃতি দিয়ে ধোয়া।
৯. শরীরে কোনে স্থানের চুল কামানো। কোন কিছুর সাহায্যে চুল উঠিয়ে ফেলা।
১০. নখ কাটা অথবা পাথর প্রভৃতিতে ঘসে সাফ করা।
১১. খুশবু লাগানো।
১২. তৈল ব্যবহার করা।
৭. ইহরাম অবস্থায় জায়েয কাজঃ
ওপরে যেসব বিষয় বলা হল তা ছাড়া সব কিছু কর জায়েয। যেমনঃ
১. কোনো ছায়ায় আরাম করা।
২. গোসল করা, মাথা ধোয়া, তবে সাবান ব্যবহার না করা।
৩. শরীর বা মাথা চুলকানো। তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে চুল উঠে না যায় অথবা চুলের উকুন পড়ে না যায়।
৪. টাকা পয়সা অস্ত্র প্রভৃতি সাথে রাখা
৫. অবসর সময়ে ব্যবসা করতে দোষ নেই। কুরআনে আছেঃ
 ******আরবী********
হজ্জের সময় তোমরা যদি তোমাদের রবের অনুগ্রহ (ব্যবসার দ্বারা মুনাফা) তালাশ কর, তাহলে তাতে কোন দোষ নেই।
৬. ইহরামের কাপড় বদলানো বা ধোয়া।
৭. আংটি ঘড়ি প্রভৃতি ব্যবহার করা।
৮. সুরমা লাগানো তবে খুশবু সুরমা নয়।
৯. খাতনা করা।
১০. নিকাহ করা।
১১. অনিষ্টকর জীব হত্যা করা। যেমন চিল,
কাক, ইঁদুর, সাপ, বিচ্ছু, বাঘ, কুকুর, প্রভৃতি। নবী (স) বলেন, হেরেমে বা
ইহরামের অবস্থায় পাঁচ প্রকারের জীব হত্যায় কোন দোষ নেই। যেমন, ইঁদুর, কাক,
চিল, বিচ্ছু, আক্রমণকারী কুকুর।
১২. সামুদ্রিক শিকার জায়েয। কোনো গায়ের মুহররম (যে ইহরাম অবস্থায় নেই)যদি স্থলের কোন শিকার তোহফা দেয় তাহলে খাওয়া জায়েয।
৮. ইহরামের পদ্ধতি:
ভালোভাবে চুল নখ কেটে গোসল করে খুশবু
লাগিয়ে ইহরামের পোশাক পরবে। অর্থাৎ এক চাদর, এক তহবন্দ পরে দু রাকায়াত নফল
নামায পড়বে। তারপর হজ্জ অথবা ওমরার নিয়ত করে তালবিয়া পড়বে। (মুফরেদ হলে
শুধু হজ্জের নিয়ত করবে। কারেন হলে হজ্জ ও ওমরাহ উভয়ের নিয়ত করবে।
মুতায়াত্তা হলে প্রথমে ওমরার নিয়ত করবে এবং ওমরাহ শেষ করে হজ্জের নিয়ত
করবে। এসব পরিভাষার জন্যে পরিভাষা দ্রষ্টব্য।) হজ্জ অথবা ওমরার নিয়ত করে
তালবিয়া পড়ার সাথে সাথে ইহরাম বাধা হয়ে যায়। তারপর সে মুহররম হয়ে যায়।
তারবিয়ার পরিবর্তে যদি কুরবানীর উট মক্কার দিকে রওয়ানা করে দেয়া হয় তাহলে
তা তালবিয়ার স্থলাভিষিক্ত হয়ে যায়।
তালবিয়া ও তার মাসয়ালা
হজ্জের নিয়ত করার পরই হেরেম যিয়ারতাকারী যেসব কথা বলে তাকে তালবিয়া বলে, যথাঃ
*******আরবী*********
হে আল্লাহ আমি হাজির। আমি তোমার ডাকে
হাজির। আমি তোমার দরবারে হাজির আছি, তোমার কোনো শরীক নেই। এটা সত্য যে,
প্রশংসা ও শোকর পাবার অধিকারী তুমি। দান ও অনুগ্রহ করা তোমারই কাজ। তোমার
প্রভুত্ব কর্তৃত্বে কেউ শরীক নেই।
১. ইহরাম বাধার পর একবার তালবিয়া পড়া ফরয। বেশী বলা সুন্নাত।
২. ইহরাম বাধার পর থেকে ১০ই যুলহাজ্জ
তারিখে প্রথম জুমরায় পাথর মারা পর্যন্ত তালবিয়া পড়তে থাকতে হবে। প্রত্যেক
নীচুতে নামার সময় এবং ওপরে ওঠার সময় প্রত্যেক কাফেলার সাথি মিলিত হবার সময়
প্রত্যেক নামাযের পর এবং সকাল-সন্ধ্যায় তালবিয়া পড়তে হবে।
৩. জোরে জোরে তালবিয়া পড়া সুন্নাত। নবী
(স) বলেন, আমার কাছে জিবরাঈল (আ ) এসে এ ফরমান পৌছিয়ে দেয় যে, আমি যেন আমার
সঙ্গীদেরকে হুকুম দেই তারা যেন উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়ে। (মুয়াত্তায়ে ইমাম
মালেক (র) তিরমিযি, আবু দাউদ প্রভৃতি। কিন্তু মেয়েরা উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া
পড়বে না। হেদায়ায় আছে মেয়েরা তালবিয়া পড়ার সময় আওয়াজ বুলন্দ করবে না।
এজন্যে যে এতে করে ফেতনার আশংকা সহতে পারে। তারা রমলও করবে না এবং সায়ী
করার সময় দৌড়াবে না। এজন্যে যে, এতে পর্দা নষ্ট হবে।)
৪. তালবিয়া পড়লে তিনবার পড়তে হবে। তিনবার পড়া মুস্তাহাব।
৫. তালবিয়া পড়ার সময় কথা বলা মাকরূহ। সালামের জবাব দেয়া যেতে পারে।
৬. যে তালবিয়া পড়ছে তাকে সালাম না দেয়া উচিত। তাকে সালাম করা মাকরূহ।

৭. তালবিয়ার পর দরুদ পড়া মুস্তাহাব।

via Blogger http://ift.tt/2uOslBi

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s