যাকাতের মহত্ব, গুরুত্ব ও শর্ত

পূর্ববর্তী শরীয়াতে যাকাত

যাকাতের এ মর্মকথা ও প্রাণশক্তি সম্পর্কে
চিন্তা ভাবনা করে দেখলে জানা যায় যে, যাকাত মুমিনের জন্যে একটি অপরিহার্য
আমল এবং একটি অপরিহার্য গুণ। এ কারণে প্রত্যেক নবীর শরীয়াতে এর হুকুম
বিদ্যমান দেখতে পাওয়া যায়।
কুরআন সাক্ষ্য দেয় যে, যাকাত সকল আম্বিয়ার
উম্মতের ওপর তেমনি ফরয ছিল যেমন নামায ফরয। সূরা আম্বিয়াতে হযরত মূসা (আ) ও
হযরত হারূন (আ) এর প্রসঙ্গে বর্ণনায় পর বিস্তারিতভাবে সে চিন্তামূলক
কথোপকথন বর্ণনা করা হয়েছে যা হযরত ইবরাহীম (আ) ও তার জাতির মধ্যে হয়েছিল।
অতঃপর এ প্রসঙ্গেই হযরত লুত (আ) হযরত ইসহাক (আ) এবং হযরত ইয়াকুব (আ) এর
উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর বলা হয়েছেঃ
এবং আমরা তাদের সকলকে নেতা বানিয়েছি। তারা
আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী হেদায়াতের কাজ করতো। এবং আমরা তাদেরকে ওহীর
মাধ্যমে নেক কাজ করার নামাযের ব্যবস্থাপনা করার যাকাত দেয়ার হেদায়াত
করেছিলাম এবং তারা সকলে ইবাদাতকারী বান্দা ছিল।
কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ঐ ওয়াদা ও শপথের
উল্লেখ করা হয়েছে যা ইহুদীদের নিকট থেকে নেয়া হয়েছিল। তার গুরুত্বপূর্ণ
দফাগুলোর মধ্যে একটি দফা এটাও ছিল যে, তারা নামায কায়েম করবে এবং যাকাত
দেবে।
এবং স্মরণ কর সেই কথা যখন আমরা বনী
ইসরাঈলের নিকট পাকা ওয়াদা নিয়েছিলাম যে, আল্লাহ ছাড়া তোমরা কারো বন্দেগী
যেন না কর, মা বাপের সাথে যেন ভালো ব্যবহার কর। আত্মীয় স্বজন এতীম ও
মিসকিনের সাথেও যেন ভালো ব্যবহার কর এবং লোকের সাথে ভালোভাবে কথা বলবে।
নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। (সুরা আল বাকারা ৮৩)
অন্য একস্থানে বনী ইসরাইলকেই আল্লাহ তায়ালা বলেন
এবং আল্লাহ (বনী ইসরাইলকে) বলেন, আমি তোমাদের সাথে আছি যদি তোমরা নামায কায়েম করতে থাক এবং যাকাত দিতে থাক।
(সূরা মায়েদা ১২)
হযরত ইবরাহীম (আ) এর পুত্র এবং নবী (স) এর
পূর্ব পুরুষ হযরত ইসমাঈল (আ) এর প্রশংসা করতে গিয়ে কুরআন বলে যে, তিনি তার
আপন লোকজনদেরকে নামায কায়েম করার ও যাকাত দেয়ার তাকীদ করতেন
এবং (ইসমাঈল) তার আপন লোকজনকে নামায ও যাকাতের জন্যে তাকীদ করতো এবং সে তার রবের পছন্দই বান্দা ছিল। (সূরা মরিয়ম ৫৫)
হযরত ঈসা (আ) তার পরিচয় পেশ করতে গিয়ে তার
নবুয়াতের পদে ভূষিত হওয়ার উদ্দেশ্যেই এটা বলেন, আমার আল্লাহ আমাকে আজীবন
নামায কায়েম করার ও যাকাত দেয়ার অসিয়ত করেন।
এবং তিনি আমাকে হুকুম করেছেন যে, নামায কায়েম করি এবং যাকাত দিতে থাকি যতদিন বেচে থাকবো। (সুরা মরিয়ম ৩১)
যাকাতের মহত্ব ও গুরুত্ব
ইসলামে যাকাতের যে অসাধারণ মহত্ব ও
গুরুত্ব রয়েছে তার অনুমান এর থেকে করা যায় যে, কুরআন পাকে অন্তত বত্রিশ
স্থানে নামায ও যাকাতের এক সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। ঈমানের পর প্রথম দাবীই
হচ্ছে নামায ও যাকাতের। প্রকৃতপক্ষে এ দুটি ইবাদাত পালন করার অর্থ গোটা
দ্বীন পালন করা। যে বান্দা মসজিদের মধ্যে আল্লাহর সামনে গভীর আবেগ সহকারে
তার দেহ ও মন বিলিয়ে দেয়, সে মসজিদের বাইরে আল্লাহর হক কিভাবে অবহেলা করতে
পারে? ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি তার প্রিয় ধন সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে
আল্লাহর পথে সন্তুষ্ট চিত্তে বিলিয়ে দিয়ে মনে গভীর শান্তি অনুভব করে, সে
অন্যান্য বান্দাদের হক কিভাবে নষ্ট করতে পারে? আর ইসলাম তো প্রকৃতপক্ষে
আল্লাহ ও বান্দার হকেরই বহিঃপ্রকাশ। এজন্যে কুরআন নামায এবং যাকাতের
ইসলামের পরিচায়ক এবং ইসলামের গণ্ডির মধ্যে প্রবেশের সাক্ষ্য বলে গণ্য করে।
সূরা তওবায় আল্লাহ তায়ালা মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা ও
অসন্তোষ প্রকাশের পর মুসলমানদেরকে এ হেদায়াত দেন যে, তারা যদি কুফর ও শিরক
থেকে তওবা করে নামায কায়েম করতে ও যাকাত দিতে থাকে, তাহলে তারা দ্বীনি ভাই
বরে গণ্য হবে। তারপর ইসলামী সমাজে তাদের সেস্থান হবে যা মুসলমানদের আছে।
যদি তারা (কুফর ও শিরক থেকে) তওবা করে এবং নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয় তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই।(সূরা আত তওবা ১১)
এ আয়াত একথাই বলে যে, নামায ও যাকাত
ইসলামের সুস্পষ্ট আলামত এবং অকাট্য সাক্ষ্য। এ জন্যে কুরআন যাকাত না দেয়াকে
মুশরিকদের নিদর্শন ও কর্মকাণ্ড বলে অভিহিত করেছে। এ ধরনের লোককে আখিরাতে
অস্বীকারকারী ও ঈমান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ধ্বংস ওসব মুশরিকদের জন্যে যারা যাকাত দেয় না এবং আখিরাত অস্বীকারকারী। (সূরা হা মীম আস সাজদা ৬-৭)
প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) এ
খেলাফত কালে যখন কিছু লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করলো তখন তিনি তাদেরকে ইসলাম
থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ও মুরতাদ হওয়ার সমতুল্য মনে করলেন এবং ঘোষণা করলেন,
এসব লোক নবীর যামানায় যে যাকাত দিতো তার মধ্যে থেকে একটি ছাগলের বাচ্চা
দিতেও যদি অস্বীকার করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করবো। হযরত উমর (রা)
সিদ্দিকে আকবরকে বাধা দিয়ে বললেন, আপনি তাদের বিরুদ্ধে কি করে জেহাদ করবেন
যেহেতু তারা কালেমায় বিশ্বাসী। তিনি আরও বলেন, নবী (স) এর ইরশাদ হচ্ছে যে,
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলবে তার জান মাল আমার পক্ষ থেকে নিরাপদ। হযরত আবু
বকর (রা) তার দৃঢ় সংকল্পের কথা ঘোষণা করে বলেন।
আল্লাহর কসম যারা নামায ও যাকাতের মধ্যে
পার্থক্য সৃষ্টি করে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই লড়াই করবো।(বুখারী,
মুসলিম)(হযরত আবু বকর (রা) যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জেহাদের যুক্তি
হিসেবে সূরা তাওবার ৫নং আয়াত পেশ করেন:
তারা যদি তওবা করে নামায কায়েম করে এবং যাকাত দেয় তাহলে তাদেরকে ছেড়ে দাও। (অনুবাদক)
নামায ও যাকাত দ্বীনের এমন দুটি রুকন বা
স্তম্ভ যা অস্বীকার করলে অথবা উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করলে তা প্রকৃতপক্ষে
আল্লাহর দ্বীন থেকে সরে পড়া এবং মুরতাদ হওয়ার সমতুল্য। আর মুমিনের কর্তব্য
হচ্ছে মুরতাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।
হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, আমাদেরকে নামায পড়ার এবং যাকাত দেয়ার হুকুম করা হয়েছে। যে যাকাত দেবে না তার নামাযও নেই- (তাবরানী)
যারা যাকাত দেয়া থেকে বিরত, কুরআন তাদেরকে হেদায়াত থেকে বঞ্চিত বলেছেঃ
হেদায়াত ঐ সব মুত্তাকীদের জন্যে যারা
গায়েবের ওপর ঈমান আনে, নামায কায়েম করে এবং যা আমি তাদেরকে দিয়েছি তার থেকে
আল্লাহর পথে খরচ করে। (সূরা আল বাকারা ২-৩)
কুরআনের দৃষ্টিতে সত্যিকার অর্থে তারাই সাচ্চা মুমিন যারা যাকাত দেয়-
যারা নামা কায়েম করে এবং আমরা তাদেরকে যা দিয়েছি তার থেকে আল্লাহর পথে খরচ করে তারাই সাচ্চা মুমিন। (সুরা আনফাল ২-৩)
নবী করীম (স) যাকাতের মহত্ব ও গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ
দানশীল ব্যক্তি আল্লাহর নিকটবর্তী
জান্নাতের নিকটবর্তী, আল্লাহর বান্দাদের নিকটবর্তী, এবং জাহান্নাম থেকে
দূরে। অপরদিকে কৃপণ আল্লাহ থেকে দূরে, জান্নাত থেকে দূরে, আল্লাহর
বান্দাদের থেকে দূরে এবং জাহান্নামের নিকটে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, একজন
জাহেল দানশীল একজন কৃপণ আবেদের তুলনায় আল্লাহর নিকটে অনেক বেশী পছন্দনীয়।
(তিরিমিযি)
যাকাত অবহেলার ভয়ংকর পরিণাম
যাকাতের অসাধারণ গুরুত্বের কারণে, কুরআন
ঐসব লোকদের জন্যে চরম যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির কথা বলেছে যারা যাকাত দেয় না।
ক্ষয়শীল ধন সম্পদের মহব্বতে উন্মত্ত হয়ে তারা যেন ভয়াবহ পরিণাম ডেকে না
আনে, তার জন্যে তাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। তারা যেন সে ভয়াবহ শাস্তি
থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখে, যার ধারণা করতেই শরীর রোমাঞ্চিত হয়।
যারা সোনা চাঁদি জমা করে রাখে এবং তা
আল্লাহর পথে খরচ করে না তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। ( সে
শাস্তি হলো এই যে,) এমন একদিন আসবে যেদিন জাহান্নামের আগুনে সেসব সোনা
চাঁদি উত্তপ্ত করা হবে এবং তারপর তা দিয়ে তাদের চেহারা ও মুখমণ্ডল,
পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। (এবং বলা হবে) এ হলো সেই ধন সম্পদ যা
তোমরা নিজেদের জন্যে জমা করে রেখেছিলে। অতএব এখন তোমাদের জমা করা সম্পদের
আস্বাদ গ্রহণ করো। (সূরা আত তওবা ৩৪-৩৫)
হযরত আবদুল্লাহ  বিন উমর (রা) কে জিজ্ঞেস
করা হয়েছিল যে, এ আয়াতে বলে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা বলতে কি
বুঝায়। তিনি বলেন বলতে সে ধন সম্পদ বুঝায় যার যাকাত দেয়া হয়নি। যারা
যাকাত দেয় না তাদেরকে সতর্ক করে দেয়ার জন্যে নবী (স) আখিরাতের ভয়ংকর আযাবের
চিত্র এভাবে এঁকেছেন।
যাকে আল্লাহ তায়ালা ধন দৌলত দিয়েছেন তারপর
সে তার ধনের যাকাত দিলো না। তখন তার ধনকে কিয়ামতের দিন বিষধর সাপের রূপ
দেয়া হবে। বিষের তীব্রতায় সে সাপের মাথা লোমহীন হবে। তার চোখ দুটি কালো দাগ
হবে। কেয়ামতের দিন সে যাকাত না দেয়া কৃপণ ব্যক্তির গলা জড়িয়ে ধরবে এবং তার
দু চোয়ালে তার বিষধর দাঁত বসিয়ে দিয়ে বলবে আমি তোর ধন সম্পদ আমি তোর
সঞ্চিত ধন দৌলত।
তারপর নবী (স) নিম্নের আয়াত তেলাওয়াত করেন:
যাদেরকে আল্লাহ তার অনুগ্রহে দান দৌলত
দিয়েছেন এবং কৃপণতা করে তারা যেন এ ধারণা না করে যে, এ কৃপণতা তাদের জন্যে
মঙ্গলজনক, বরঞ্চ এ তাদের জন্য অত্যন্ত অমঙ্গলজনক। কৃপণতা করে যা কিছু তারা
জমা করে রেখেছে কেয়ামতের দিন তা হাসুলি বানিয়ে তাদের গলায় পরিয়ে দেয়া হবে।
(সুরা আলে ইমরান ১৮০)
উপরন্তু নবী পাক (স) যাকাত অবহেলা করার ভয়ানক পরিণাম থেকে বাচার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে নসীহত করেন, তিনি বলেন-
কেয়ামদের দিন তোমাদের মধ্য কেই যেন আমার
কাছে এ অবস্থায় না আসে যে, তার ছাগল তার ঘাড়ের ওপর চাপানো থাকবে এবং সে
সাহায্যর জন্যে আমাকে ডাকবে। আমি তখন বলবো আজ তোমার জন্যে আমি কিছুই করতে
পারবো না আমি তোমাকে আল্লাহর হুকুম আহকাম পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর দেখ,
সেদিন তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার উট তার ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে আমার নিকটে না
আসে। সে সাহায্যের জন্যে আমাকে ডাকবে এবং আমি তাকে বলবো তোমার জন্যে আমি
কিছুই করতে পারবো না। আমি তো আল্লাহর হুকুম তোমাকে পৌছিয়ে দিয়েছিলাম।
(বুখারী)
একদিন নবী (স) দেখলেন যে, দুজন মহিলা হাতে
সোনার কঙ্কণ পরিধান করে আছে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এর যাকাত
দাও কিনা। তারা না বললে নবী বললেন, তোমরা কি তাহলে এটা চাও যে, এ সবের
পরিবর্তে তোমাদের আগুনের কঙ্কণ পরানো হবে? তারা বললো না না, কখনোই না।
তখন নবী (স) বললেন, এ সবের যাকাত দিতে থাকো। (তিরমিযি)
হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেন, নবী
(স) খুতবা দিতে গিয়ে বলেন, হে লোকেরা! লোভ লালসা থেকে দূরে থাকো। তোমাদের
পূর্বে যারা ধ্বংস হয়েছে তারা এ লোভ লালসার জন্যেই হয়েছে। লোভ তাদের মধ্যে
কৃপণতা ও মনের সংকীর্ণতা সৃষ্টি করেছিল। ফলে তারা কৃপণ ও ধনের পূজারী হয়ে
পড়ে। এ তাদেরকে আপনজনের প্রতি দয়া মায়ার সম্পর্ক ছিন্ন করতে প্রেরণা দেয়
এবং তারা দয়া মায়া ছিন্ন করার অপরাধ করে বসে। এ তাদেরকে পাপাচার প্রেরণা
দেয় এবং তারা পাপাচার করে। (আবু দাউদ)
কুরআন ও সুন্নাতের এসব সাবধান বাণীর ফলে
সাহাবায়ে কেরাম (রা) ……. সদকার ব্যাপারে অত্যন্ত তৎপর ছিলেন। অনুভূতি এতোটা
তীব্র ছিল যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কপর্দকও কাছে রাখা হারাম মনে
করতেন। আবু যর (রা) এর তো চির অভ্যাস ছিল যে, যখনই তিনি একত্রে কিছু লোক
দেখতেন তখন যাকাতের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন।
যাকাতের তাকীদ ও প্রেরণা
যাকাতের অসাধারণ গুরুত্ব ও মহত্বের কারণে
কুরআন পাকের বিরাশি স্থানে এর তাকীদ করা হয়েছে। সাধারণত নামায ও যাকাতের
কথা এক সাথে বলা হয়েছে। যেমন:
এবং নামায কায়েম কর ও যাকাত দাও।
কুরআন ও সুন্নাতের তার বিরাট দ্বীনি ও দুনিয়াবি ফায়দার কথা বলে বিভিন্নভাবে এজন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। যেমন:
 
যারা তাদের মাল আল্লাহর পথে খরচ করে তাদের
এ খরচের দৃষ্টান্ত একটি শস্যদানার মতো যে দানা থেকে সাতটি শীষ বের হয় এবং
প্রত্যেক শীষে একশটি দানা হয়। এভাবে আল্লাহ যে আমলকে চান তাকে বাড়িয়ে দেন
এবং আল্লাহ প্রশস্ত ও মুক্ত হস্ত এবং জ্ঞানী (সূরা বাকারা ২৬১)
কৃষক তার শস্যবীজ আল্লাহর যমীনের কাছে
হস্তান্তর করে আশায় দিন গুনতে থাকে এবং বৃষ্টির জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া
করতে থাকে। তাপর আল্লাহ তাকে একটি বীজের পরিবর্তে অগণিত শস্য দানা দান
করেন। এ ঈমান উদ্দীপক অভিজ্ঞতাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করে আল্লাহ এ কথা
বুঝাতে চান যে, বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে যা কিছু খরচ করবে আল্লাহ
তা এতোটা বাড়িয়ে দেবেন যে, এক একটি দানার বিনিময়ে সাতশ দানা দান করবেন।
বরঞ্চ এর চেয়ে অধিকও তিনি দিতে পারেন। বান্দার গভীর নিষ্ঠা এবং আবেগ
উচ্ছ্বাসের স্বীকৃতি আল্লাহ দিয়ে থাকেন। তিনি এতো পরিমাণে দান করেন যে,
বান্দা তার ধারণাই করতে পারে না। আর এ দান ও ……… আখিরাতের জন্যেই নির্দিষ্ট
নয়, বরঞ্চ দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা ………. সমাজকে মঙ্গল ও বরকত, সচ্ছলতা ও
উন্নতি দান করে থাকেন।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে তোমরা যে যাকাত দাও, যাকাত দানকারী প্রকৃতপক্ষে তার মাল বর্ধিত করে। (সূরা আর রূম ৩৯)
প্রকৃত ব্যাপার এই যে, যাকাত, সদকা
প্রভৃতি তারাই দেয় যারা উদার, দানশীল, পরস্পর সহানুভূতিশীল, শুভাকাঙ্ক্ষী।
আর এসব গুণাবলী সৃষ্টি করে যাকাত ও সদকা।দুনিয়াতে মঙ্গল ও বরক, শান্তি,
নিরাপত্তা, উন্নতি ও সচ্ছলতা ঐ সমাজের ভাগ্যে জোটে যার লোকের মধ্যে এসব
গুণাবলী সাধারণভাবে পাওয়া যায়, ধন মুষ্টিমেয় স্বার্থপর, সংকীর্ণচেতা ও
কৃপণের হাতে পুঞ্জিভূত হয় না। বরঞ্চ গোটা সমাজে তার সুষম বণ্টন হয় এবং
সকলের আপন আপন সাহস ও যোগ্যতা অনুযায়ী জীবিকা অর্জন ও খরচ করার স্বাধীনতা
থাকে এবং সকলে একই প্রকার সুযোগ সুবিধা লাভ করে।
হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, নবী (স)
বলেছেন, যে ব্যক্তি তার পবিত্র উপার্জন থেকে একটি খেজুরও সদকা করে, আল্লাহ
সেটা নিজ হাতে নিয়ে বর্ধিত করতে থাকেন যেমন তোমরা তোমাদের সন্তান প্রতিপালন
কর, তারপর সেটা একটা পাহাড়ের সমান হয়ে যায়। (বুখারী)
হযরত আবু হুরাইরা (রা) আরও বলেন, নবী (স)
বলেছেন, সদকা দেয়াতে মাল কম হয় না (বেড়েই যায়) কাউকে ক্ষমা করাতে মহত্বই
বাড়ে (তাতে অপমান হয় না) এবং যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর জন্যে বিনয় ও নম্রতা
অবলম্বন করে আল্লাহ তাকে উচ্চমর্যাদা দান করেন। (মুসলিম)
কুরআন সুস্পষ্ট করে বলে যে, অন্তরকে
পাক-পবিত্রকারী, সৎ পথের পথিক, হিকমতের গুণে গুণান্বিত আল্লাহর সন্তুষ্টি,
মাগফেরাত ও রহমত লাভকারী, আখিরাতের চিরন্তন শান্তি ও আল্লাহর
নৈকট্য লাভকারী ঐসব লোক যারা সন্তুষ্টচিত্তে হরহামেশা যাকাত দিতে থাকে।
(হে নবী) তাদের মাল থেকে সদকা গ্রহণ করে তাদেরকে পাক কর এবং নেকির পথে তাদেরকে অগ্রসর কর। (সূরা আত তওবা ১০৩)
শয়তান তোমাদেরকে অভাব ও দৈন্যের ভয় দেখায়
এবং অশ্লীল ও লজ্জাজনক কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করারে প্ররোচনা দেয়। অন্যদিকে
আল্লাহ তোমাদেরকে তার মাগফেরাত ও করুণার আশ্বাস দেন এবং তিনি মুক্ত হস্ত
এবং বিজ্ঞ। তিনি যাকে চান হিকমত দান করেন। আর যে হিকমত লাভ করে প্রকৃতপক্ষে
সে বিরাট সম্পদ লাভ করে। (সূরা আল বাকারা ২৬৮-২৬৯)
এবং তারা যা কিছু আল্লাহর পথে খরচ করে তা
আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং রাসূল (স) এর পক্ষ থেকে রহমতের দোয়া নেবার উপায়
বানায়। মনে রেখো, ও অবশ্যই আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় এবং আল্লাহ অবশ্যই
তাদেরকে তার রহমতের মধ্যে নিয়ে নেবেন। নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমা দয়াশীল। (সূরা
আত তওবা ৯৯)
এবং জাহান্নামের আগুন থেকে ঐ ব্যক্তিকে
দূরে রাখা হবে যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করে এবং যে এজন্য অপরকে মাল দান
করে যাতে করে তার মন কৃপণতা লোভ ও দুনিয়ার মোহ থেকে পাক হয়। (সূরা আল লাইল
১৭-১৮)
হযরত আদী বিন হাতিম (র) বলেন, নবী (স) কে
একথা বলতে শুনেছি হে লোকেরা! জাহান্নামের আগুন থেকে বাচ, খুরমা খেজুরের এক
টুকরা দিয়ে হলেও। (বুখারী)
হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন নবী (স)
বলেছেন, কেয়ামতের দনে আল্লাহর আরশ ছাড়া যখন কোথাও কোনো ছায়া থাকবে না, তখন
সাত রকমের লোক আরশের ছায়ায় থাকতে পারবে। তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি এমন হবে,
যে এমন গোপনে আল্লাহর পথে খরচ করে যে, তার বাম হাত জানতে পারবে না ডান কি
খরচ করলো। (বুখারী)
নবী (স) এর দরবারে কেউ সদকার মাল নিয়ে
হাজির হতো যখন তিনি অত্যন্ত খুশী হতেন এবং তার জন্যে রহমতের দোয়া করতেন।
একবার হযরত আবু আওফা (রা) সদকা নিয়ে নবীর দরবারে হাজির হন। তখন নবী (স) তার
জন্যে নিম্নের দোয়া করেন:
হে আল্লাহ আবু আওফার পরিবারের ওপর তোমার রহমত নাযিল কর। (বুখারী)
একবার নবী পাক (স) আসরের নামাযের পরেই ঘরে
চলে যান এবং কিছুক্ষণ পর বাইরে আসেন। সাহাবায়ে কেরাম কারণ জিজ্ঞেস করলে
তিনি বললেন, সোনার এক টুকরা ঘরে রয়েছিল। রাত পর্যন্ত তা ঘরের পড়ে থাকবে এটা
আমি ঠিক মনে করলাম না। তাই তা অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে এলাম।
(বুখারী)
হযরত আনাস (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন, সদকা ও দান করার ফলে আল্লাহর রাগ ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং খারাপ ধরনের মৃত্যু থেকে মানুষ রক্ষা পায়।
একথা ঠিক যে, আল্লাহর গযব থেকে নিরাপদ এবং খাতেমা বিল খায়ের (ঈমানের সাথে মৃত্যু) ছাড়া একজন মুমিনের চরম ও পরম বাসনা আর হতে পারে?
যাকাতের হুকুম
প্রত্যেক সাহেব নেসাবের (সচ্ছল ব্যক্তি)
ওপর ফরজ যে, যদি তার কাছে নেসাব পরিমাণ মাল এক বৎসর যাবত মজুদ থাকে, তাহলে
তার যাকাত সে অবশ্যই দেবে। যাকাত অপরিহার্য ফরজ। এ ফরজ কেউ অস্বীকার করলে
সে কাফের হবে। আর যে ফরজ হওয়া অস্বীকার করে না বটে কিন্তু যাকাত দেয় না সে
ফাসেক এবং কঠিন গুনাহগার।
যাকাত ও ট্যাক্সের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণের উপর যে
ট্যাক্স ধার্য করা হয়, যাকাত এ ধরনের কোন জিনিষ নয়। এ হচ্ছে একটি আর্থিক
ইবাদত। এবং দ্বীন ইসলামের অন্যতম রোকন বা স্তম্ভ, নামাজ রোজা ইসলামের রোকন।
কুরআনে নামাজের সাথে সাথেই সাধারণত যাকাতের উল্লেখ আছে। এ হচ্ছে আল্লাহর
সেই দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ যা প্রত্যেক যুগে নবীগণের দ্বীন ছিল।
যাকাত ব্যবস্থার ফলে মানুষের মনে ও ইসলামী
সমাজে যে বিরাট নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সুফল হয় তা একমাত্র তখনই হতে পারে যখন
ইবাদত ও ট্যাক্সের মৌলিক পার্থক্য মনে বদ্ধমূল থাকবে এবং যাকাত আল্লাহর
ইবাদত মনে করেই দেওয়া হবে।
অবশ্য যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের ব্যবস্থাপনা
ইসলামী রাষ্ট্রের উপরই ন্যস্ত করা হয়েছে। এবং এ আইন শৃঙ্খলার একটা
দায়িত্ব। কিন্তু এ জন্য নয় যে, এ একটি ট্যাক্স বা সরকার আরোপিত কোন কর।
বরঞ্চ ইসলামের সকল সামষ্টিক ইবাদতে একটা শৃঙ্খলা বিধান করা ইসলামী
রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
যাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্ত
যাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্ত সাতটি।(আহলে
হাদীসের দৃষ্টিতে প্রথম পাঁচটি শর্ত জরুরী। তাদের নিকটে জ্ঞান সম্পন্ন
(সজ্ঞান) ও বালেগ হওয়া যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য জরুরী নয়। তাদের দলিল হচ্ছে
কুরআনের বাণী …..আরবী…… যাকাত দাও। এবং প্রত্যেক মুসলমান নারী পুরুষের
জন্যে এবং …….আরবী ……. (হে নবী) তাদের মাল তেকে সদকা নিয়ে তাদেরকে পাক এবং
তাদের তাযকিয়া কর। পবিত্রতা ও তাযকিয়া প্রত্যেক মুসলমানদের আবশ্যক। সে
জন্যে প্রত্যেক মুসলমান নারী পুরুষের ওপর যাকাত ফরয। সে জ্ঞানবান ও বালেগ
হোক বা না হোক। আহলে হাদীস ছাড়া অন্যান্য আলেমগণও পরের দুটি শর্ত স্বীকার
করেন না। অর্থাৎ যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্যে জ্ঞান সম্পন্ন ও বালেগ হওয়াকে
শর্ত বলে গণ্য করেন না।)
(১) মুসলমান হওয়া.
(২) নেসাবের মালিক হওয়া.
(৩) নেসাব প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া.
(৪) ঋণগ্রস্ত না হওয়া.
(৫) মাল এক বছর স্থায়ী হওয়া.
(৬) জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া.
(৭) বালেগ হওয়া.
নিম্নে এসব শর্তের বিশ্লেষণ দেওয়া হলোঃ
১. মুসলমান হওয়া।অমুসলিমের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। অতএব যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলো, তাকে তার অতীত জীবনের যাকাত দিতে হবে না।
২. নেসাবের মালিক হওয়া।অর্থাৎ এতো পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে যার উপর শরীয়ত যাকাত ওয়াজিব করেছে।
৩. নেসাব প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া।
প্রকৃত প্রয়োজন বলতে বুঝায় এমন সব জিনিষ যার উপর মানুষের জীবন যাপন ও
ইজ্জত আব্রু নির্ভরশীল যেমন খানা-পিনা, পোশাক-পরিচ্ছেদ, বাসের বাড়ি-ঘর,
পেশাজীবী লোকের যন্ত্রপাতি, মেশিন প্রভৃতি। যানবাহনের পশু, সাইকেল মোটর
প্রভৃতি, গৃহস্থালি সরঞ্জাম, পড়াশুনার বই-পুস্তক, (বিক্রির জন্য নয়) এসব
কিছু প্রকৃত প্রয়োজনের জিনিষ। এসবের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। তবে অতিরিক্ত
মাল নেসাবের পরিমাণ হলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে, যদি অন্যান্য শর্তগুলোও
থাকে।
৪. ঋণগ্রস্ত না হওয়া।যেমন কোন ব্যক্তির
নিকটে নেসাবের পরিমাণ মাল আছে বটে কিন্তু অপরের কাছে তার ঋণ রয়েছে। তাহলে
যাকাত ওয়াজিব হবে না। তবে এতো পরিমাণ মাল আছে যে, ঋণ পরিশোধ করার পরও
নেসাবের পরিমাণ মাল অবশিষ্ট থাকে তাহলে যাকাত ওয়াজিব হবে।
৫. মাল এক বছরকাল স্থায়ী হওয়া। নেসাব
পরিমাণ মাল হলেই তার যাকাত ওয়াজিব হবে না। বরঞ্চ সে পরিমাণ মাল এক বছর
স্থায়ী হলে তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে।
হযরত ইবনে উমর (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন,
কোন ব্যক্তি যে কোনো উপায়েই সম্পদ লাভ করুক তার ওপর যাকাত তখনই ওয়াজিব হবে
যখন তা পূর্ণ এক বছরকাল স্থায়ী থাকবে। (তিরমিযি)
৬. জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া। যে ব্যক্তি জ্ঞান বুদ্ধি থেকে বঞ্চিত যেমন পাগল। তার ওপর যাকাত ওয়াজিব নয়।
৭. বালেগ হওয়া। নাবালেগ শিশুর ওপর যাকাত
ওয়াজিব নয়, তার কাছে যতোই মাল থাক না কেন। তার ওপর যাকাত ওয়াজিব নয়। তার
অলীর ওপরও ওয়াজিব নয়। (এ প্রসঙ্গে আল্লামা মওদূদী নিম্নরূপ অভিমত ব্যক্ত
করেন। নাবালেগ শিশুদের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। একটা মত এই যে, এতিমের ওপর
যাকাত ওয়াজিব নয়। দ্বিতীয় মত হচ্ছে এই যে, এতিম সাবালক হওয়ার পর তার অলী
তার সম্পদ তাকে হস্তান্তর করার সময় তাকে যাকাতের বিবরণ বলে দেবে। তখন তার
কাজ হচ্ছে এই যে, সে তার এতিম থাকাকালীন সময়ের পুরো যাকাত আদায় করবে।তৃতীয়
মত এই যে, এতিমের মাল যদি কোনো কারবারে লাগানো হয়ে থাকে এবং তার মুনাফা
হচ্ছে তাহলে তার অলী যাকাত দেবে। অন্যথায় যাকাত ওয়াজিব হবে না। চতুর্থ মত
এই যে, এতিমের মালের ওপর যাকাত ওয়াজিব এবং তা দেয়ার দায়িত্ব অলীর। এ চতুর্থ
অভিমত অধিকতর সঠিক। হাদীসে আছে:
অর্থাৎ সাবধান, যে ব্যক্তি এমন এতিমের অলী
যার মাল আছে তার উচিত, তার মালে কোনো ব্যবসা করবে এবং তা এমনি পড়ে থাকতে
দেবে না, যাতে তার সব মাল যাকাতে খেয়ে না ফেলে। (তিরমিযি, দারে কুতনী,
বায়হাকী)
এর সম অর্থবোধক একটি মুরসাল হাদীস ইমাম
শাফেয়ী (র) এবং মরফু হাদীস তাবারানী ও আবু উবায়দ থেকে বর্ণিত আছে। তার
সমর্থক সাহাবা ও তাবেঈন দ্বারা পাওয়া যায় যা হযরত উমর (রা) হযরত আয়েশা
(রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) এবং হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে
বর্ণিত আছে।
মস্তিষ্ক বিকৃত লোকের সম্পর্কেও এ ধরনের
মতভেদ আছে যেমন উপরে বলা হয়েছে। এতেও আমাদের মতে সঠিক অভিমত এই যে, পাগলের
মালেরও যাকাত ওয়াজিব এবং তা আদায় করার দায়িত্ব অলীর। ইমাম মালেক (র) এবং
ইবনে সোহাব যুহরী ও অভিমতেরই ব্যাখ্যা করেছেন। (রাসায়েল ও মাসায়েল, দ্বিতীয়
খন্ড, পৃ.১৩০, ১৩৮)
যাকাত আদায় সহীহ হওয়ার শর্ত
যাকাত আদায় সহীহ হওয়ার শর্ত ছয়টি। এ ছয়টি শর্ত পাওয়া গেলে যাকাত আদায় হবে। অন্যথায় হবে না। যেমন-
১. মুসলমান হওয়া,
২. যাকাত দেয়ার নিয়ত করা,
৩. নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা,
৪. মালিকানা বানিয়ে দেয়া,
৫. জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া,
৬. বালেগ হওয়া। নিম্নে এ সবের বিশ্লেষণ ও ফায়দা বর্ণিত হলোঃ
১. মুসলমান হওয়া। যাকাত সহীহ হওয়ার শর্ত
এই যে, যাকাতদাতাকে মুসলমান হতে হবে। যেহেতু অমুসলিমের উপর যাকাত ওয়াজিব
নয়। সে জন্যে কোনো অমুসলিম যাকাত দিলে তা হবে না। অতএব ইসলাম গ্রহণের
পূর্বে যদি কেউ ভবিষ্যতের যাকাত দিয়ে দেয় এবং তারপর ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে
পূর্বের দেয়া যাকাত দিয়ে দেয় এবং তাপর ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে পূর্বের
দেয়া যাকাত সহীহ হবে না। মুসলমান হওয়ার পর পুনরায় যাকাত দিতে হবে।
২. যাকাত দেয়ার নিয়ত করা। যাকাত বের করার
সময় অথবা হকদারকে দেয়ার সময় যাকাত দেয়ার নিয়ত জরুরী। যাকাত বের করার সময়
যাকাতের নিয়ত না করলে হবে না। যাকাতের জন্য এটা প্রয়োজন যে, সে মাল হকদারের
কাছে পৌঁছে যেতে হবে।
৩. যাকাত দেওয়ার সময় যাকাত গ্রহণকারীকে
তার মালিক বানাতে হবে। সে মালিক হকদারকে বানানো হোক অথবা যাকাত আদায়কারী ও
বণ্টনকারী সংস্থাকে করা হোক।
৪. নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা। যাকাত দেয়ার খাত কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। এসব ছাড়া অন্য কোন খাতে ব্য করলে তা হবে না।
৫. জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া। মস্তিষ্ক বিকৃত অথবা পাগল যাকাত দিলে তা হবে না।
৬. বালেগ হওয়া।নাবালেগ শিশু যাকাত দিলে তা হবে না।
যাকাত ওয়াজিব হওয়ার কিছু মাসায়েল
১. প্রকৃত প্রয়োজনের জন্য যে অর্থ রাখা
হয়েছে তা যদি ঐ বছরেই খরচ করার প্রয়োজন হয় তাহলে তার যাকাত দিতে হবে না। আর
যদি সে বছরের পর ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে তাহলে তার যাকাত দিতে হবে।
-(ইলমুল ফেকাহ-৪র্থ)
২. যে মালের মধ্যে অন্য কোন হক, যেমন ওশর, খেরাজ প্রভৃতি ওয়াজিব হয় তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। (ইলমুল ফেকাহ-৪র্থ)
৩. কেউ যদি কোন কিছু কারো কাছে রেহেন বা
বন্ধক রাখে তাহলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। যে রেহেন দেবে এবং যে নেবে
তাদের কারো ওয়াজিব হবে না।-(ইলমুল ফেকাহ-৪র্থ)
৪. কারো কোন মাল হারিয়ে গেলে কিংবা অর্থ
হারিয়ে গেল। তারপর কিছু কাল পরে আল্লাহর ফযলে তা পাওয়া গেলে এবং হারানো
অর্থ হস্তগত হলে, তাহলে হারানোর সময় ওয়াজিব হবে না। এজন্য যে, যাকাত ওয়াজিব
হওয়ার জন্য মাল নিজেরে আয়ত্বে এবং মালিকানায় থাকা দরকার।
৫. কারো কাছে বছরের প্রথমে নেসাবের পরিমাণ
মাল মওজুদ ছিলো। মাঝখানে কিছু সময় তা হারিয়ে গেল অথবা নিঃশেষ হয়ে গেল।
তারপর বছরের শেষভাগে আল্লাহর ফযলে নেসাবের পরিমাণ মাল হয়ে গেল। তাহলে সে
মালের যাকাত ওয়াজিব হবে। মাঝামাঝি সময় মাল না থাকা ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য
হবে না।-(ইলমুল ফেকাহ)
৬. কেউ গ্রেফতার হলে তার মালের যাকাত দিতে
হবে। তার অবর্তমানে যে ব্যক্তি তার কারবার চালাবে অথবা তার মালের
মোতায়াল্লি হবে সে যাকাত দেবে। (রাসায়েল ও মাসায়েল-২য় খন্ড)
৭. মুসাফিরের মালের উপর যাকাত ওয়াজিব যদি
সে নেসাবের মালিক হয়। অবশ্যি মুসাফির হওয়ার কারণে গ্রহণেরও হকদার হবে।
কিন্তু যদি সে ধনী ও সাহেবে নেসাব। সে জন্য তার উপর যাকাত ওয়াজিব। তার সফর
তাকে যাকাতের হকদার বানায় এবং তার মালদার হওয়া তার উপর যাকাত ফরজ হয়।
(বেহেশতী জিউর-৩য় খন্ড)
৮. কেউ কাউকে কিছু দান করলো। তা যদি নেসাবের পরিমাণ হয় এবং এক বছর অতীত হয় তাহলে তার যাকাত ওয়াজিব হবে। (ঐ)
৯. ঘরের সাজ সরঞ্জাম, যেমন তামা, পিতল,
এলুমিনিয়াম, স্টিল, প্রভৃতির বাসনপত্র, পড়নের ও গায়ে দেওয়ার কাপড়-চোপড়,
শতরঞ্জি, ফরাস, ফার্নিচার, প্রভৃতি, সোনা চাঁদি ছাড়া অন্য ধাতুর অলংকার,
মতির অলংকার, মতির হার, প্রভৃতি, যতোই মূল্যবান হোক, তার উপর যাকাত ওয়াজিব
হবে না। (ঐ)
১০. কোন উৎসবের জন্য কেউ বহু পরিমাণ
শস্যাদি খরিদ করলো। তারপর মুনাফার জন্য তা বিক্রি করে দিল। তার উপর যাকাত
ওয়াজিব হবে না। যাকাত ঐ মালের উপর ওয়াজিব হবে না যা ব্যবসার নিয়তে কেনা
হবে। (ঐ)
১১. কারো কাছে হাজার টাকা ছিলো। বছর পূর্ণ
হওয়ার পর পাঁচশ টাকা নষ্ট হয়ে গেল এবং বাকী পাঁচশ সে ব্যক্তি খয়রাত করে
দিল। তাহলে নষ্ট হওয়া টাকার যাকাতই ওয়াজিব রইলো খয়রাতের টাকার যাকাত আদায়
হয়ে যাবে। (ইমাম শাফেয়ী (র) এর মতে সমুদয় টাকার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। যদি
ব্যবসায় মোট টাকা নেসাবের পরিমাণ বা তার বেশী হয় তাহলে যাকাত ওয়াজিব হবে
পৃথকভাবে প্রত্যেক অংশীদারের অংশ নেসাব পরিমাণ না হলেও।)
১২. যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পর কারো সব সহায় সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেলে তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে না।
১৩. কোন ব্যবসায় কয়েক ব্যক্তি অংশীদার।
সকলের টাকাই লাগানো হয়েছে। যদি প্রত্যেক অংশীদারের পৃথক পৃথক অংশ নেসাবের
কম হয় তাহলে কারো ওপরে যাকাত ওয়াজিব হবে না, তাদের সকলের মোট অংশ নেসাব
পরিমাণ হোক বা তার অধিক হোক।

১৪. কোনো ব্যক্তি রমযান মাসে দু হাজার
টাকার যাকাত দিয়ে দিল। এ দু হাজার টাকা তার কাছে সংরক্ষিত রয়ে গেল। এখন রজব
মাসে আল্লাহর ফজলে আরও দু হাজার অতিরিক্ত সে পেয়ে গের। এখন বছর পূর্ণ
হওয়ার পর তাকে চার হাজারের যাকাত দিতে হবে। তার একথা মনে করলে চলবে না যে,
সে রজব মাসে যা পেলো তা এক বছর পূর্ণ হয়নি। বছরের ভেতরে যে টাকা বা মাল
বাড়বে, তা ব্যবসার মুনাফার কারণে হোক অথবা পশুর বাচ্চা হওয়ার কারণে হোক।
অথবা দান বা মীরাস পাওয়ার কারণে হোক, মোট কথা যেভাবেই মাল বা অর্থ পাওয়া
যাক না কেন, সব মালের যাকাত দিতে হবে পরবর্তী সময়ে পাওয়া মাল বা অর্থ এক
বছর পূর্ণ না হলেও তার যাকাত দিতে হবে।

via Blogger http://ift.tt/2hNHyZQ

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s