নেসাব ও যাকাতের হার আদায়

৪০টি ভেড়া ছাগলে একটি ভেড়া বা ছাগল।
৪১ থেকে১২০ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো যাকাত ওয়াজিব নয়।
১২১ হলে দুটি ছাগল যাকাত দিতে হবে।
১২২ থেকে ২০০ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো যাকাত নেই।
২০১ হলে তিনটি ছাগল।
২০২ থেকে ৩৯৯ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো যাকাত নেই।
৪০০ হলে ৪টি ছাগল বা ভেড়া যাকাত দিতে হবে।
৪০০ এর পরে ১০০ পুরো হলে একটা ছাগল বা
ভেড়ার হিসেবে যাকাত ওয়াজিব হবে। অর্থাৎ শতকরা একটি করে। ভেড়া ছাগলের যাকাত
এক বছর বা তার বেশী বয়সের বাচ্চা যাকাত দিতে হবে।
গরু মহিষের নেসাব ও যাকাতের হার
যাকাতের ব্যাপারে গরু ও মহিষের একই হুকুম।
হযরত ওমর বিন আবদুল আযীয (র) মহিষকে গরু হিসেবে ধরে তার ওপর ঐ ধরনের যাকাত
আরোপ করেন যা নবী (স) নির্ধারণ করেছিলেন। উভয়ের নেসাব ও যাকাতের হার এক
কারো কাছে উভয় ধরনের পশু থাকলে উভয়কে মিলিয়ে নেসাব পূর্ণ হলে যাকাত ওয়াজিব
হবে। যার সংখ্যা বেশী হবে তার মধ্যে থেকে যাকাত দিতে হবে। উভয়ের সংখ্যা
সমান হলে যে কোনো একটা দেয়া যাবে।
নেসাব ও যাকাতের হার
যে ব্যক্তি ৩০টি গরু মহিষের মালিক হবে তার ওপর যাকাত ফরয হবে। তার কম হলে যাকাত নেই।
৩০টি গরু মহিষের মধ্যে গরু বা মহিষের একটি বাচ্চা দিতে হবে যার বয়স পূর্ণ এক বছর হয়েছে।
৩১ থেকে ৩৯ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো যাকাত নেই। ৪০টি গরু মহিষ হলে এমন একটি বাচ্চা যাকাত দিতে হবে যার বয়স পূর্ণ দু বছর।
৪১ থেকে ৫৯ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো যাকাত
নেই। ৬০টি গরু মহিষ হলে এক বছরের দুটি বাচ্চা যাকাত দিতে হবে। ষাটের পরে
প্রত্যেক ৩০ গরু মহিষ এক বছরের বাচ্চা এবং প্রত্যেক ৪০ গরু মহিষে দু বছরের
বাচ্চা দিতে হবে।
যেমন ধরুন কারো কাছে ৭০টি গরু মহিষ আছে।
এখন ৭০টিতে দু নেসাব আছে একটা তিরিশের এবং অন্যটা চল্লিশের। যদি ৮০টি গরু
মহিষ হয় তাহলে চল্লিশ চল্লিশের দু নেসাব হবে। অতএব দু বছরের দু বাচ্চা
ওয়াজিব হবে। ৯০টি হলে ত্রিশ ত্রিশের তিন নেসাব হবে। যার জন্যে প্রত্যেক
৩০টির ওপর এক বছরের বাচ্চার হারে যাকাত দিতে হবে।
উটের নেসাব ও যাকাতের হার
যে ব্যক্তি পাঁচটি উটের মালিক হবে সে সাহেবে নেসাব হবে। তার ওপর যাকাত ওয়াজিব। তার কম উটের যাকাত নেই।
নেসাব ও যাকাতের বিবরণ
পাঁচটি উটের ওপর একটি ছাগল ওয়াজিব এবং ৯টি উট পর্যন্ত ঐ একটি ছাগল।
দশটি উট হলে দুটি ছাগল এবং ১৪টি পর্যন্ত ঐ দুটিই।
পনেরোটি উট হলে তিনটি ছাগল এবং ১৯টি পর্যন্ত ঐ একই।
বিশটি উটে ৪টি ছাগল এবং ২৪টি পর্যন্ত ঐ একই।
পঁচিশটি উটের ওপর এমন এক উটনী যার বয়স দ্বিতীয় বছর শুরু হয়েছে।
২৬ থেকে ৩৫ পর্যন্ত অতিরিক্ত কিছু দিতে হবে না। ৩৬টি উট হলে এমন এক উটনী দিতে হবে যার বয়স তৃতীয় বছর শুরু হয়েছে।
৩৭ থেকে ৪৫ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোন যাকাত নেই।
৪৬টি হলে উট হলে এমন এক উটনী দিতে হবে যার বয়স চতুর্থ বছর শুরু হয়েছে।
৪৭ থেকে ৬০ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো যাকাত নেই।
৬১টি হলে এমন এক উটনী দিতে হবে যার বয়স পঞ্চম বছর শুরু হয়েছে।
৬২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো যাকাত নেই।
৭৬ হলে দুটি উটনী যাদের বয়স তৃতীয় বছর শুরু হয়েছে।
৭৭ থেকে ৯০ পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো যাকাত নেই।
৯১ হলে দুটি এমন উটনী যাদের বয়স চতুর্থ বছর শুরু হয়েছে।
১২০ পর্যন্ত উপরোক্ত দুটি উটনী।
তারপর পুনরায় সেই হিসেব শুরু হবে অর্থাৎ ৫টির ওপর এক ছাগল, ১০টির উপর দু ছাগল।
যাকাত দানের ব্যাপারে একটি জরুরী ব্যাখ্যা
সোনা,চাঁদি ও পশুর যে যাকাত ওয়াজিব হবে তা
সোনা, চাঁদি এবং পশুর আকারেও দেয়া যাবে এবং নগদ টাকাও দেয়া যাবে। অলংকারের
যাকাতে সোনা চাঁদি দেয়া জরুরী নয়। বাজারের প্রচলিত নিরিখে তার মূল্য ধরে
নগদও দেয়া যায়।
কোন কোন খাতে যাকাত ব্যয় করা যায়
কুরআন পাকে আল্লাহ তায়ালা শুধু যাকাতের
গুরুত্ব ও মাহাত্ম বয়ান করে তার জন্যে শুধু তাকীদই করেননি, বরঞ্চ বিশদভাবে
তার ব্যয় করার খাতগুলোও বলে দিয়েছেন।
********** আরবী ************
এ সদকা তো ফকীর মিসকিনদের জন্যে এবং তাদের
জন্য যারা সদকার কাজের জন্য নিয়োজিত এবং তাদের জন্য যাদের মন জয় করা
উদ্দেশ্য। এবং শৃঙ্খলা মুক্ত করার জন্যে। ঋণগ্রস্তদের সাহায্যে জন্যে।
আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্যে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে অবশ্য পালনীয় ফরয
আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে ওয়াকেফহাল এবং মহাজ্ঞানী।
(সূরা আত তাওবাঃ৬০)
এ আয়াতে যাকাতের আটটি খাতের কথা বলা হয়েছেঃ
১) ফকীর বা দরিদ্র, ২) মিসকিন অভাবগ্রস্ত
অথচ হাত পাতে না, ৩) যাকাত আদায় ও বণ্টনের কর্মচারী, ৪) মন জয় করার
উদ্দেশ্যে, ৫) শৃংখলমুক্ত করার জন্যে, ৬) ঋণগ্রস্তদের জন্যে, ৭) ফী
সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে, ৮) পথিক মুসাফির।
যাকাত এ আটা খাতেই ব্যয় করা যেতে পারে তার বাইরে নয়।
হযরত যিয়াদ বিন আল হারেস (রা) একটি ঘটনা
বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী (স) এর খেদমতে এক ব্যক্তি হাযির হয়ে বললো,
যাকাত থেকে আমাকে কিছু দিন। নবী (স) বললেন, আল্লাহ যাকাত ব্যয় করার খাতগুলো
কোনো নবীর ওপর ছেড়ে দেননি আর না কোনো নবীর ওপর। বরঞ্চ তিনি স্বয়ং তার
ফায়সালা করে দিয়েছেন। তার আটটি খাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তুমি যদি এ
খাতগুলোর মধ্যে পড় তাহলে অবশ্যই তোমাকে যাকাত দিয়ে দেব।
খাতগুলোর বিশদ বিবরণ
১. ফকীর: ফকীর বলতে সে
সব নারী পুরুষকে বুঝায় যারা তাদের জীবন ধারণের জন্যে অপরের সাহায্য
সহযোগিতায় ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে ঐসব দুঃস্থ, অভাবগ্রস্ত, অক্ষম অপারগ
ব্যক্তি শামিল যারা সাময়িকভাবে অথবা স্থায়ীভাবে আর্থিক সাহায্যের হকদার।
জীবিকা অর্জনে অক্ষম ব্যক্তি, পঙ্গু, এতিম শিশু, বিধবা, স্বাস্থ্যহীন,
দুর্বল, বেকার এবং যারা দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্বীকার এমন
লোকদেরকে সাময়িকভাবে যাকাতের খাত থেকে সাহায্য করা যেতে পারে এবং তাদের
জন্যে স্থায়ী ভাতাও নির্ধারিত করা যেতে পারে।
২. মিসকীনঃ মিসকিন বলতে
ঐসব দরিদ্র সম্ভ্রান্ত লোক বুঝায় যারা খুবই দুস্থ ও অভাবগ্রস্ত হওয়া
সত্ত্বেও সম্মানের ভয়ে ও লজ্জায় কারো কাছে হাত পাতে না। জীবিকার জন্যে
আপ্রাণ চেষ্টা ও পরিশ্রম করার পরও দু মুঠো ভাত জোগাড় করতে পারে না, তবুও
নিজের দুঃখের কথা কাউকে বলে না। হাদীসে মিসকিনের সংজ্ঞা এভাবে বর্ণনা করা
হয়েছেঃ
********** আরবী ************
যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ
পায় না, আর না তাকে (তার আত্মসম্মানের জন্যে) বুঝতে বা চিনতে পারা যায়, যার
জন্যে লোক তাকে আর্থিক সাহায্য করতে পারে, আর না সে বেরিয়ে পড়ে লোকের কাছে
কিছু চায়। (বুখারী, মুসলিম)
৩. যাকাত বিভাগের কর্মচারী
***** আরবী *****: এরা হচ্ছে ঐসব লোক, যারা যাকাত, ওশর আদায় করে, তার
রক্ষণাবেক্ষণ করে,বণ্টন করে এবং তার হিসেব পত্র সংরক্ষণ করে। তারা সাহেবে
নেসাব হোক বা না হোক তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের বেতন যাকাত থেকে দেয়া
যেতে পারে।
৪. যাদের মন জয় করা উদ্দেশ্য *****
আরবী ****: এ হচ্ছে ঐসব লোক যাদের মন জয় করা উদ্দেশ্য। ইসলাম ও ইসলামী
রাষ্ট্রের স্বার্থে তাদেরকে হাত করা, তাদের বিরোধিতা বন্ধ করা প্রয়োজন হয়।
এসব লোক কাফেরও হতে পারে এবং ঐসব মুসলমানও হতে পারে যাদের ইসলাম তাদেরকে
ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রের খেদমতের জন্যে উদ্বুদ্ধ করতে যথেষ্ট নয়। এসব লোক
সাহেবে নেসাব হলেও তাদেরকে যাকাত দেয়া যেতে পারে।
হানাফীদের অভিমত এই যে, ইসলামের সূচনায় এ
ধরনের লোকের মন জয় করার জন্য যাকাত থেকে খরচ করা হতো। কিন্তু হযরত ওমর (রা)
হযরত আবু বকর (রা) এর যমানায় এ ধরনের লোককে যাকাত দিতে অস্বীকার করেন
(প্রকৃত ঘটনা এই ছিল যে, নবী (স) এর ইন্তেকালের পর উয়ায়না বিন হাসান এবং
আকরা বিন হারেস হযরত আবু বকর (রা) এর কাছে এক খন্ড যমী দাবী করেন। তিনি
তাদেরকে দানের ফরমান লিখে দেন। তারা চাইছিল যে, বিষয়টিকে মজবুত করার জন্যে
অন্যান্য সাহাবীগণও সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করুক। কিছু স্বাক্ষরও হলো।
তারপর যখন হযরত ওমর (রা) এর সাক্ষ্য নিতে গেল তখন তিনি ফরমান পড়ার পর তাদের
চোখের সামনেই ছিঁড়ে ফেলে দেন। তাদেরকে বলেন, নবী (স) তোমদের মন জয় করার
জন্যে তোমাদেরকে এরূপ দিতেন। কিন্তু সেটা ছিল ইসলামের দুর্বলতা যুগ। এখন
আল্লাহ ইসলামকে তোদের মুখাপেক্ষী করে রাখেননি। তারপর তারা হযরত আবু বকর
(রা) এর নিকটে অভিযোগ করে বলে, খলীফা কি আপনি, না ওমর? কিন্তু না হযরত আবু
(রা) এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করলেন, আর না অন্যান্য সাহাবীগণ হযরত ওমর (রা)
থেকে ভিন্ন মত প্রকাশ করলেন। এর থেকে হানাফীগণ এ যুক্তি পেশ করেন যে, যখন
মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেল এবং এমন শক্তির অধিকারী হলো যে, তারা নিজেদের
পায়ের ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হলো, তখন স অবস্থা আর রইলো না যার কারণে মন জয়
করার জন্যে একটা অংশ রাখা হয়েছিল। অতএব সাহাবীদের ইজমার ভিত্তিতে ঐ অংশ
চিরদিনের জন্যে রহিত হয়ে গেল) এবং এ ব্যবস্থা চিরদিনের জন্যে রহিত হয়ে যায়।
এ অভিমত ইমাম মালেকও পোষণ করেন। অবশ্যি
কোনো কোনো ফকীহর মতে এ খাত এখনো বাকী রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুসারে মন জয়
করার জন্যে যাকাতের মাল ব্যয় করা যেতে পারে। (আল্লামা মওদূদী (র) এ
সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে বলেনঃ আমাদের নিকটে সঠিক এটাই যে,
মুয়াল্লেফাতু কুলুব এর অংশ কেয়ামত পর্যন্ত রহিত হওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
নিঃসন্দেহে হযরত ওমর (রা) যা কিছু বলেছিলেন তা ঠিক ছিল। যদি ইসলামী রাষ্ট্র
মন জয় করার জন্যে অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজনবোধ না করে, তাহলে কেউ তার ওপরে
এটা ফরয করে দেননি যে, এ খাতে অবশ্যই কিছু না কিছু খরচ করতে হবে। কিন্তু
কোনো সময়ে যদি তার প্রয়োজন হয়, তাহলে আল্লাহ তার জন্যে অবকাশ রেখেছেন, তা
বাকী থাকা উচিত। হযরত ওমর (রা) এবং সাহাবায়ে কেরামের যে বিষয়ের ওপর ইজমা
হয়েছিল তা এই যে, সে সময়ে যে অবস্থা ছিল তখন মন জয় করার জন্যে কাউকে কিছু
দেয়া তারা জরুরী মনে করেননি। তার থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো সংগত কারণ
নেই যে, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা ঐ খাতকে কেয়ামত পর্যন্ত রহিত করে দিয়েছে যা
কুরআনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বাঞ্ছনীয়তার জন্যে রাখা হয়েছিল। (তাহফীমুল
কুরআন, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ২০৭, ইমাম শাফেয়ীরও তাই মত)
৫. শৃংখলমুক্ত করা (গোলাম আযাদ করা):
অর্থাৎ যে গোলাম তার মনিবের সাথে এরূপ চুক্তি করেছে যে, এতো টাকা দিলে
তাকে মুক্ত করে দেবে, এমন গোলামকে বলে মাকাতিব। আযাদীর মূল্য পরিশোধ করার
জন্যে মাকাতিবকে যাকাত দেয় যেতে পারে। সাধারণ গোলামকে যাকাতের টাকা দিয়ে
আযাদ করা জায়েয নয়। কোনো সময়ে যদি গোলাম বিদ্যমান না থাকে, তাহলে এ খাত
রহিত হয়ে যাবে।
৬.ঋণগ্রস্তঃ যারা ঋণের
বোঝায় পিষ্ট এবং আপন প্রয়োজন পূরণের পর ঋণ পরিশোধ করতে পারে না। বেকার হোক
অথবা উপার্জনশীল এবং এতো সম্পদ নেই যে কর্জ পরিশোধের পর নেসাব পরিমাণ মাল
তার কাছে থাকবে। ঋণগ্রস্তের মধ্যে তারাও মাশিল যারা কোনো অপ্রত্যাশিত
দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, কোনো ক্ষতিপূরণ অথবা জরিমানা দিতে হয়েছে অথবা
ব্যবসা-বাণিজ্য নষ্ট নষ্ট হয়ে গেছে অথবা অন্য কোনো দুর্ঘটনার সব সম্পদ
ধ্বংস হয়ে গেছে।
৭. ফী সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে):
এর অর্থ আল্লাহর পথে জেহাদ। কেতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধের তুলনায় জেহাদ শব্দটি
সাধারণত ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। জেহাদ ফী সাবিলিল্লাহর মধ্যে যে সমুদয়
চেষ্টা চরিত্র শামিল যা মুজাহিদগন কুফরী ব্যবস্থাকে নির্মূল করে ইসলামী
ব্যবস্থা কায়েমের জন্যে করে থাকেন। সে চেষ্টা চরিত্র কলমের দ্বারা হোক, হাত
মুখ ও তরবারির দ্বারা হোক অথবা কঠোর শ্রম সাধনার দ্বারা হোক তার সীমারেখা
এতো সীমিত নয় যে, তার অর্থ সশস্ত্র যুদ্ধ এবং তার এতোটা ব্যাপকও নয় যে, তার
মধ্যে দৈনন্দিন সকল সমাজকল্যাণমূলক কাজও শামিল করা যায়। অতীতে ইসলামের
মনীষীগণ জেহাদে ফী সাবিলিল্লাহর সর্বসম্মতভাবে এ অর্থই গ্রহণ করেছেন যে, তা
এমন সব চেষ্টা চরিত্র যা দ্বীনে হক কায়েম করার জন্যে, তার প্রচার ও
প্রসারের জন্যে, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্যে করা হয়। এ চেষ্টা
চরিত্র যারা করে তাদের যাতায়াত খরচ, যানবাহন, অস্ত্রশস্ত্র ও সাজসরঞ্জাম
সংগ্রহ করার জন্যে যাকাত থেকে অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে।
৮. পথিক বা মুসাফিরঃ
পথিক বা প্রবাসীর নিজ বাড়িতে যত ধন সম্পদ থাকুক না কেন, কিন্তু পথে বা
প্রবাসে সে যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তবে তাকে যাকাতের টাকা দিতে হবে।
যাকাতের অর্থ ব্যয় সম্পর্কে কিছু কথাঃ
১. এটা জরুরী নয় যে, যাকাতের অর্থ সব
খাতেই ব্যয় করতে হবে যা কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। বরঞ্চ প্রয়োজন অনুসারে ও
সুযোগ সুবিধা মত যে যে খাতে যতোটা মুনাসিব মনে করা হবে ব্যয় করা যেতে পারে।
এমনকি যদি প্রয়োজন হয় তাহলে কোনো একটি খাতে সমুদয় অর্থ ব্যয় করা যেতে
পারে।
২. যাকাত ব্যয় করার যেসব খাত, ওশর এবং সদকায়ে ফিতরেরও সেই খাত। নফল সদকা অবশ্যি দাতার এখতিয়ারাধীন।
৩. বনী হাশিমের লোক যদি যাকাত আদায় ও
বণ্টনের কাজে নিযুক্ত হয় তাহলে তাদেরকে যাকাত থেকে পারিশ্রমিক দেয়া জায়েয
হবে না। নবী (স) তার নিজের ওপর এবং বনী হাশিমের লোক বিনা পারিশ্রমিকে এ
খেদমত করতে চাইলে করতে পারেন যেমন নবী (স) স্বয়ং যাকাত আদায় ও বণ্টনের কাজ
করেছেন।
৪. সাধারণ অবস্থায় কোনো ব্যক্তির যাকাত সে
বস্তিরই অভাবগ্রস্ত ও দুঃস্থদের মধ্যে ব্যয় করা উচিত, এটা মুনাসিব নয় যে,
সে বস্তির লোক বঞ্চিত থাকবে এবং যাকাত অন্য স্থানে পাঠানো হবে। তবে অন্য
স্থানের প্রয়োজন যদি তীব্র হয় অথবা দীনি বাঞ্ছনীয়তার দাবী হয়, যেমন কোথাও
ভূমিকম্প হয়েছে অথবা দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে অথবা কোনো আকস্মিক বিপদ এসেছে,
কিংবা প্রলয়ঙ্কর ঝড়-তুফান হয়েছে, অথবা অন্য স্থানে কোনো দ্বীনি মাদরাসা আছে
যার আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন, অথবা কোনো আত্মীয় স্বজন আছে, তাহলে অন্য
স্থানে যাকাত পাঠানো জায়েয। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যে, নিজ বস্তির লোক
একেবারে যেন বঞ্চিত না হয়।
যাদের যাকাত দেয়া জায়েয নয়
সাত প্রকারের লোককে যাকাত দেয়া জায়েয নয়। দিলে যাকাত আদায় হবে না।
১. বাপ-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, তাদের বাপ-মা।
২. সন্তান-সন্ততি, নীচের দিক পর্যন্ত যথা ছেলে-মেয়ে, পৌত্র, প্রপৌত্র, নাতী-নাতনী প্রভৃতি।
৩. স্বামী।
৪. স্ত্রী।
এসব লোককে যাকাত দেয়ার অর্থ আপনজনদেরকে
উপকৃত করা। তবে তার অর্থ এটাও কখনো নয় যে, লোক তার মাল দ্বারা এসব লোকের
কোনো সাহায্য করবে না। বরঞ্চ শরীয়াতের দৃষ্টিতে তাদের ভরণ পোষণ ও দেখা শুনা
করা প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য। উপরোক্ত চার ধরনের আত্মীয় ছাড়া
অন্যান্য সকল আত্মীয় স্বজনকে যাকাত দেয়া শুধু জায়েযই ……. অতি উত্তম ও বেশী
সওয়াবের বিষয়।
৫. সাহেবে নেসাব সচ্ছল ব্যক্তিকে যাকাতের
অর্থ দেয়াও নাজায়েয। কোনো গরীব দুঃস্থকে এতোটা দেয়াও জায়েয নয় যে, সে
সাহেবে নেসাব হয়ে যায়। তবে যদি সে ঋণগ্রস্ত হয় অথবা অধিক সন্তানের মালিক হয়
তাহলে প্রয়োজন অনুসারে বেশী পরিমাণ দেয়া যেতে পারে। নবী (স) বলেন, সদকা
মালদারের জন্যে জায়েয নয় এ পাঁচ ধরনের লোক ছাড়া, যথা (১) আল্লাহর পথে
জেহাদকারী, (২) ঋণগ্রস্ত,( ৩) সদকা আদায় ও বন্টনকার, (৪) এমন ব্যক্তি যে
তার অর্থ দিয়ে সদকার মাল খরিদ করে, (৫) এমন ব্যক্তি যার প্রতিবেশী মিসকিন
এবং মিসকিন এবং মিসকিন তার ধনী প্রতিবেশীকে তার প্রাপ্ত সদকা হাদীয়া পেশ
করে। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)
৬. অমুসলিমকে যাকাত দেয়াও জায়েয নয়।
৭. বনী হাশিমের বংশধরদের নিম্নের তিন গোত্রকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়।
(ক) হযরত আব্বাস (রা) এর বংশধর।
(খ) হারেসের বংশধর।
(গ) আবু তালেবের বংশধর।
হযরত আলী (রা) ও হযরত ফাতেমা (রা) এর সন্তানগণ উক্ত তৃতীয় গোত্রের।
অবশ্যি আজকাল এ যাচাই করা মুস্কিল যে,
প্রকৃতপক্ষে বনী হাশিমের বংশধর কে। অতএব বায়তুলমাল থেকে তো প্রত্যেক
অভাবগ্রস্তের সাহায্য পাওয়া উচিত। তবে যদি কারো হাশেমী হওয়ার নিশ্চয়তা থাকে
তাহলে তার যাকাত নেয়া উচিত নয়।
ইমাম মালেক (র) বলেন, নবী (স) বলেন, সদকার
মাল মুহাম্মাদ (স) এর আওলাদের জন্যে জায়েয নয়। এজন্যে যে, সদকা লোকের ময়লা
তো বটে। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)

via Blogger http://ift.tt/2h63EK2

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s